রাশিয়ার সার কারখানায় ড্রোন হামলা, নিহত ৭

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৯ বার
রাশিয়ার সার কারখানায় ইউক্রেনের ড্রোন হামলা

প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাশিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত একটি শিল্পকারখানায় ভয়াবহ ড্রোন হামলার ঘটনায় অন্তত সাতজন নিহত এবং আরও অন্তত দশজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় প্রশাসন ও তদন্ত সূত্রের বরাতে জানা গেছে, বুধবার গভীর রাতে স্মোলেনস্ক অঞ্চল-এর একটি বড় সার উৎপাদন কারখানাকে লক্ষ্য করে একাধিক ড্রোন হামলা চালানো হয়। হামলার সময় কারখানার ভেতরে কর্মরত শ্রমিক ও প্রযুক্তিবিদদের অনেকেই বিস্ফোরণের শব্দে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং মুহূর্তের মধ্যেই পুরো এলাকা আগুন ও ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালালেও বিস্ফোরণের তীব্রতায় হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যায়।

রুশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলাটি সংঘটিত হয়েছে এমন একটি স্থাপনায় যেখানে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট ও নাইট্রিক অ্যাসিড উৎপাদন করা হয়। এই রাসায়নিক উপাদানগুলো সাধারণত সার তৈরিতে ব্যবহৃত হলেও বিস্ফোরক তৈরির ক্ষেত্রেও ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। সে কারণে হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে কারখানাটি কৌশলগত গুরুত্ব বহন করতে পারে বলে ধারণা করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা। রাশিয়ার সরকারি তদন্ত সংস্থা রাশিয়ার তদন্ত কমিটি জানায়, প্রায় ৩০টি ড্রোন একযোগে আক্রমণ চালায় এবং স্থাপনাটির গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোতে আঘাত হানে। সংস্থাটির প্রাথমিক তদন্তে বলা হয়েছে, ড্রোনগুলো দূরপাল্লার সক্ষমতাসম্পন্ন এবং সুনির্দিষ্টভাবে স্থাপনাটির উৎপাদন অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাঠানো হয়েছিল।

আঞ্চলিক গভর্নর ভ্যাসিলি আনোখিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে হামলাটিকে ‘বর্বর সন্ত্রাসী হামলা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শত্রুপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে একটি বেসামরিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করেছে, যা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পরিপন্থী। তিনি আরও জানান, দমকল ও জরুরি সেবার দল দ্রুত পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে এবং আহতদের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তবে বিস্ফোরণের ফলে কোনো ধরনের রাসায়নিক দূষণ ছড়িয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞ দল নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা চালাচ্ছে।

হামলার পর নিরাপত্তাজনিত কারণে কাছাকাছি অবস্থিত দোরোগোবুঝ শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। স্কুলগুলোতে অনলাইন ক্লাস চালু করা হয়েছে এবং শিশুদের জন্য পরিচালিত কিন্ডারগার্টেনগুলো পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে। একই সঙ্গে আশপাশের আবাসিক এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের শব্দ এতটাই তীব্র ছিল যে কয়েক কিলোমিটার দূর থেকেও তা শোনা গেছে এবং অনেক বাড়ির জানালার কাচ ভেঙে গেছে।

এই হামলার বিষয়ে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি ইউক্রেন সরকার। তবে যুদ্ধের সাম্প্রতিক গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশটি দূরপাল্লার ড্রোন হামলার সক্ষমতা বাড়িয়েছে এবং সীমান্ত থেকে বহু দূরের লক্ষ্যবস্তুতেও আঘাত হানতে পারছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই কৌশলের উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রতিপক্ষের শিল্প ও জ্বালানি অবকাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি করা।

চলতি সপ্তাহের শুরুতেই রাশিয়ার তাতারস্তান প্রজাতন্ত্রের কালেইকিনো এলাকায় অবস্থিত একটি তেল পাম্পিং স্টেশন ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে রুশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন এই হামলা পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের ধারণা, শিল্পকারখানা ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা চালানো হলে তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া কর্তৃক পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে যুদ্ধ এখন পঞ্চম বছরে প্রবেশ করেছে। দীর্ঘ এই সংঘাতে উভয় পক্ষই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং যুদ্ধের রণকৌশলেও এসেছে পরিবর্তন। স্থলযুদ্ধে বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ায় এখন প্রযুক্তিনির্ভর আক্রমণ, বিশেষ করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ড্রোন যুদ্ধ আধুনিক সংঘাতের নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে কম খরচে দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা সম্ভব হচ্ছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সম্প্রতি জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং আগামী মার্চের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র-এর মধ্যস্থতায় সম্ভাব্য ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে। তবে প্রধান অচলাবস্থা রয়ে গেছে দনবাস অঞ্চলকে কেন্দ্র করে, যা নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান এখনো পরস্পরবিরোধী।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, দীর্ঘায়িত এই সংঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। শিল্পকারখানা, জ্বালানি স্থাপনা ও পরিবহন অবকাঠামোতে হামলা হলে শুধু সামরিক সক্ষমতাই নয়, বেসামরিক জীবনযাত্রাও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে এবং পরিবেশগত ঝুঁকিও তৈরি হয়। স্মোলেনস্কের ঘটনায় রাসায়নিক দূষণের আশঙ্কা নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগ সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই হামলা যুদ্ধের নতুন পর্যায়ের ইঙ্গিত দিতে পারে, যেখানে উভয় পক্ষই প্রতিপক্ষের অর্থনৈতিক ও শিল্পভিত্তিকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। এর ফলে সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং শান্তি আলোচনার সম্ভাবনাও জটিল হয়ে উঠতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইতিমধ্যে উভয় পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছে, কারণ যুদ্ধের বিস্তার হলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়তে পারে।

ঘটনাস্থলে উদ্ধারকাজ শেষ হলেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে নিহতদের পরিবারে। স্থানীয় প্রশাসন নিহতদের পরিবারকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে এবং আহতদের চিকিৎসা ব্যয়ের দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তবে এই হামলা আবারও স্মরণ করিয়ে দিল, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে সামনের সারি আর পেছনের সারির পার্থক্য ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধরেখা থেকে শত শত কিলোমিটার দূরের শহরও এখন ঝুঁকিমুক্ত নয়।

বিশ্ব রাজনীতির পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, সামরিক ও কূটনৈতিক দুই ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে। যুদ্ধের সমাপ্তি কবে এবং কীভাবে হবে তা এখনো অনিশ্চিত, তবে স্মোলেনস্কের এই হামলা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে সংঘাতের প্রভাব সীমান্ত ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—সহিংসতার চক্র থামিয়ে স্থায়ী শান্তির পথ খুঁজে বের করা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত