কুয়াকাটায় জেলিফিশের অস্বাভাবিক আক্রমণ, পর্যটক ও মৎস্য ঝুঁকিতে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৪ বার
কুয়াকাটা সৈকতে একের পর এক মৃত জেলিফিশ ভেসে আসছে কেন?

প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে প্রতিদিন হাজার হাজার জেলিফিশ ভেসে আসছে, যা স্থানীয়দের জীবনকে জটিল ও পর্যটকদের জন্য অস্বস্তিকর করে তুলেছে। সৈকতের বালুচরে আটকা পড়ে কিছু জেলিফিশ মারা যাচ্ছে এবং তাদের পচন থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। সম্প্রতি দুই–তিন সপ্তাহ ধরে ২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ কুয়াকাটা সৈকতের বিস্তীর্ণ অংশ জুড়ে এই অস্বাভাবিক দৃশ্য প্রতিনিয়ত চোখে পড়ছে। মৃত জেলিফিশের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে আশেপাশের এলাকায়, যা স্থানীয়দের স্বাভাবিক জীবন ও পর্যটকদের ভ্রমণকে ব্যাহত করছে।

সৈকতের সঙ্গে সরেজমিনে দেখা গেছে, স্বচ্ছ ছাতার মতো দেহের জেলিফিশ ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসে আসছে। কিছু জীবিত অবস্থায় বালুচরে আটকা পড়ে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে, আবার অনেক মৃত হয়ে গড়াগড়ি করছে। স্থানীয় পর্যটকরা জানান, জেলিফিশের উপস্থিতি পর্যটনকেন্দ্রে সমস্যা সৃষ্টি করছে। জেলেরাও বলছেন, নদীতে জাল ফেলার সময় জেলিফিশ জালের সঙ্গে প্যাঁচিয়ে যায়, জাল ছিঁড়ে নষ্ট হয় এবং মাছ ধরা ব্যাহত হয়।

গবেষকরা মনে করছেন, কুয়াকাটায় জেলিফিশের এমন অস্বাভাবিক বৃদ্ধি সমুদ্রের পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য সতর্ক সংকেত। জেলিফিশ সাধারণত সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের অংশ, যা শিকারি মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বড় মাছ, যেমন কাছিম এবং টুনা-ম্যাকারেল এগুলো খেয়ে থাকে। তবে অতিরিক্ত মাছ আহরণ, অবৈধ ট্রলিং এবং দূষণের কারণে এসব শিকারি মাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় জেলিফিশের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জেলিফিশ মাছের ডিম ও পোনা খেয়ে ফেলে, যা ভবিষ্যতে মৎস্যসম্পদকে ঝুঁকিতে ফেলছে।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য জীববিজ্ঞান ও জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রাজিব সরকার বলেন, “পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। খাদ্যশৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটলে একটি প্রজাতির সংখ্যা কমে গেলে অন্যটি অত্যধিক বৃদ্ধি পায়। এটা সমুদ্রের ইকোলজিক্যাল ভারসাম্যের জন্য শঙ্কাজনক।” তিনি আরও যোগ করেন, “উপকূলে ভেসে আসা জেলিফিশের সংখ্যা বেড়ে যাওয়াটা ভবিষ্যতের মৎস্যসম্পদের জন্য সতর্ক সংকেত। দ্রুত গবেষণা এবং টেকসই মৎস্য ব্যবস্থাপনা ছাড়া পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।”

স্থানীয়রা বলেন, জেলিফিশের শরীরে লেগে গেলে চুল ও ত্বকের ক্ষতি হতে পারে। মাছ শিকার বা পর্যটনকেন্দ্রে এটি স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করছে। স্থানীয় জেলেরা জানান, জেলিফিশ জালের সঙ্গে প্যাঁচিয়ে গেলে মাছ ধরা ব্যাহত হয় এবং জাল নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া মৃত জেলিফিশের দুর্গন্ধ দীর্ঘ সময় ধরে জায়গা জুড়ে থাকে, যা পর্যটকদের জন্য অস্বস্তিকর।

গবেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, যদি দ্রুত টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়, তাহলে জেলিফিশের এমন অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ভবিষ্যতে সমুদ্রের পরিবেশ এবং মৎস্যশিল্পকে আরও গুরুতর সমস্যার মুখে ফেলতে পারে। সমুদ্রের খাদ্যশৃঙ্খলে শিকারি মাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় জেলিফিশের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়ে যাচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে মৎস্যসম্পদ ও স্থানীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

জেলিফিশকে স্থানীয়রা ‘সাদা জেলিফিশ’ বা ‘নোনা’ বলে চেনে। এর বৈজ্ঞানিক নাম ফাইলোরিজা পাংটাটা। বছর দুয়েক আগে এই অঞ্চলে একই রকম জেলিফিশের আধিক্য দেখা গিয়েছিল, যা পরিবেশের ভারসাম্যের জন্য পূর্বাভাস ছিল। গবেষকরা মনে করছেন, পুনরায় এমন পরিস্থিতি দেখা দেয়া এক ধরনের সতর্ক সংকেত, যা সমুদ্রের খাদ্যশৃঙ্খল ও স্থানীয় মৎস্যজীবীদের জীবিকাকে প্রভাবিত করছে।

পর্যটকরা বলছেন, সৈকতে জেলিফিশের উপস্থিতি স্বাভাবিক পর্যটনকেন্দ্রের জন্য বিপজ্জনক। বিশেষ করে শৈশব, বৃদ্ধ ও স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ পর্যটকদের জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যটকদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গবেষকরা মনে করছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধুমাত্র তৎকালীন পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। টেকসই মৎস্য ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, অবৈধ মাছ আহরণ প্রতিরোধ এবং সামুদ্রিক দূষণ রোধ করা জরুরি। এছাড়া উপকূলের স্বাস্থ্য ও পর্যটনক্ষেত্রে প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করতে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার প্রয়োজন।

জেলিফিশের এই অস্বাভাবিক বিস্তার কেবল কুয়াকাটা সৈকত নয়, সমুদ্রজীবনের ভারসাম্য রক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে জেলিফিশের অতিরিক্ত উপস্থিতি মৎস্যসম্পদ, স্থানীয় অর্থনীতি এবং পর্যটন শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। সমুদ্রের খাদ্যশৃঙ্খল রক্ষা ও স্থানীয়দের জীবনযাত্রা অক্ষত রাখতে প্রশাসন ও গবেষকদের মধ্যে সমন্বয় অপরিহার্য বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত