প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডের পর ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নীরবতা নিয়ে প্রবীণ কংগ্রেস নেতা সোনিয়া গান্ধী সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেছেন, নীরবতা ‘নিরপেক্ষ নয়, বরং অবস্থান ত্যাগ’ হিসেবে ধরা যায়। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত একটি কলামে গান্ধী বিস্তারিত লিখেছেন, তেহরানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কেবল সভ্যতার নয়, কৌশলগতও, তাই এমন পরিস্থিতিতে সরকারের নীরবতা উদ্বেগজনক।
খামেনি হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর ভারতের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক নিন্দা বা সমালোচনা করা হয়নি। মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে সংযম ও উত্তেজনা হ্রাসের আহ্বান ছাড়া অন্য কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। গান্ধী মন্তব্য করেছেন, এমন সময়ে সরকারের নীরবতা আন্তর্জাতিক নীতির প্রতি বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
১ মার্চ ইরান নিশ্চিত করেছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল যৌথভাবে খামেনিকে হত্যা করেছে। হত্যাকাণ্ডটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। গান্ধী বলেছেন, প্রাথমিকভাবে মার্কিন-ইসরাইলের হামলা উপেক্ষা করে প্রধানমন্ত্রী শুধু সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপর ইরানের প্রতিক্রিয়ার নিন্দা করেছেন এবং পূর্ববর্তী ঘটনাবলি সম্পর্কে মন্তব্য করা হয়নি। তিনি বলেন, এই নীরবতা কূটনৈতিক নিরপেক্ষতার অভাব হিসেবে ধরা যায়।
গান্ধী আরও উল্লেখ করেছেন, এমন পরিস্থিতিতে যখন একজন বিদেশি নেতার হত্যার ফলে দেশের সার্বভৌমত্ব বা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘিত হয় না, তবুও নিরপেক্ষতা ত্যাগ করা হলে তা পররাষ্ট্র নীতির দিকনির্দেশনা এবং দেশটির আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তিনি লিখেছেন, যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়াই ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাঝেই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক রীতিনীতির লঙ্ঘন স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে।
খামেনির হত্যার মাত্র ৪৮ ঘন্টা আগে প্রধানমন্ত্রী মোদি ইসরাইল সফর থেকে দেশে ফেরেন। সেখানে তিনি ইসরাইল সরকারের প্রতি স্পষ্ট সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। গান্ধী মন্তব্য করেছেন, ভারতের নীরবতা মধ্যপ্রাচ্য কৌশল এবং তেহরানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।
তিনি ভারতের কৌশলগত অবস্থানও উল্লেখ করেন। বলেন, তেহরান পাকিস্তান সীমান্তের কাছে ভারতের কূটনৈতিক উপস্থিতি সক্ষম করেছে, যা গোয়াদর বন্দর এবং চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের উন্নয়নের ভারসাম্য রক্ষার একটি উপায় হিসেবে কাজ করছে। এই কারণে কেন্দ্রের নীরবতা কেবল নৈতিক নয়, কৌশলগত প্রভাবও ফেলতে পারে।
শনিবার ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে হামলা চালিয়ে খামেনিকে হত্যা করে। হামলার জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্থাপনা ও তেল আবিবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুঁড়ে প্রতিক্রিয়া দেখায়। এতে অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। গান্ধী মন্তব্য করেছেন, ভারতের অবস্থান এই উত্তেজনার মধ্যে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, খামেনি হত্যাকাণ্ড ও ভারতের নীরবতার সমন্বয় মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা এবং ভারতের কৌশলগত স্বার্থের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। ভারতের নীরবতা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নীতি এবং নৈতিকতার দিক থেকে ব্যাখ্যার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মানবিক ও কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, কোনো আন্তর্জাতিক হত্যাকাণ্ডে নিরপেক্ষ থাকা কখনোই সহজ নয়। তবে সাবধানী বিবৃতি এবং সুক্ষ্ম কৌশল প্রয়োজন, যাতে দেশের কৌশলগত স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা সমানভাবে রক্ষা পায়। গান্ধী স্পষ্ট করেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের পদক্ষেপের অভাব দেশের নীতি ও নৈতিকতার সমালোচনার সুযোগ তৈরি করছে।
বর্তমানে পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হলেও, আন্তর্জাতিক মনিটর এবং কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা ভারতের নীতির প্রতি দৃষ্টি রেখেছেন। গান্ধীর মন্তব্য ভারতীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সরকারের কৌশলগত ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ নিয়ে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।