একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি জাহানারা আরজু প্রয়াত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩ মার্চ, ২০২৬
  • ৯ বার
একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি জাহানারা আরজু

প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র, একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি ও সাহিত্য সম্পাদক জাহানারা আরজু (৯৪) জীবনাবসান করেছেন। সোমবার (২ মার্চ) দুপুর দেড়টার দিকে গুলশানে নিজ বাসভবনে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন তিনি। জাহানারা আরজু বাংলা সাহিত্যের এক প্রথিতযশা চরিত্র হিসেবে সর্বজনের মনে অমর হয়ে থাকবেন।

জাহানারা আরজু ১৯৩২ সালের ১৭ নভেম্বর মানিকগঞ্জের জাবরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা আফিল উদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী এবং মাতা খোদেজা খাতুন। তার স্বামী সাবেক উপরাষ্ট্রপতি ও বিচারপতি এ কে এম নুরুল ইসলাম। ছোটবেলা থেকেই জাহানারা আরজুর সাহিত্যচর্চা শুরু হয়। অষ্টম শ্রেণিতে থাকাকালীন তিনি হাতে লেখা পত্রিকা ‘অঞ্জলি মোর গুঞ্জরণী’ প্রকাশ করেন। আশ্চর্যজনকভাবে পত্রিকাটির আশীর্বচন লিখেছিলেন অবিভক্ত বাংলার কিংবদন্তি নেত্রী শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং মহাকবি কায়কোবাদ।

জাহানারা আরজু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম মহিলা সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘সুলতানা’-র প্রতিষ্ঠাকালীন সম্পাদক ছিলেন। ১৯৪৯ সাল থেকে তিনি কবি সুফিয়া কামালের সঙ্গে যৌথভাবে এই পত্রিকা সম্পাদনা করেন। ‘সুলতানা’ নারীদের সাহিত্যচর্চা ও জাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। পরবর্তীতে তিনি রাইটার্স গিল্ডের পত্রিকা ‘পরিক্রম’-এ যুগ্ম সম্পাদক, টিবি অ্যাসোসিয়েশনের পাক্ষিক ‘হেলথ বুলেটিন’-এর প্রধান সম্পাদক এবং ‘সেতুবন্ধন’ সাহিত্যপত্রিকার সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন।

জাহানারা আরজুর সাহিত্যচর্চা ছিল প্রকৃতি, প্রেম, সমাজ ও মানুষের জীবনকে কেন্দ্র করে। তার প্রথম কবিতা ১৯৪৫ সালে ‘আজাদ’ পত্রিকার মুকুলের মাহফিলে প্রকাশিত হয়। এরপর নিয়মিত তার লেখা সওগাত, মোহাম্মদী, বেগম, মিল্লাত ও ইত্তেহাদসহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তার রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘নীলস্বপ্ন’ (১৯৬২), ‘রৌদ্র ঝরা গান’ (১৯৬৪), ‘সবুজ সবুজ অবুঝ মন’, ‘আমার শব্দে আজন্ম আমি’, ‘ক্রন্দসী আত্মজা’, ‘বাদল মেঘে মাদল বাজে’ এবং ১৯৭১ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বিষয়ক কবিতাসমগ্র ‘শোণিতাক্ত আখর’।

বাংলা সাহিত্যে তার অবদানের জন্য ১৯৮৭ সালে তিনি বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক একুশে পদকসহ মোট ২৬টি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন। তার সাহিত্যকর্মে সহজ-সরল ভাষা, আন্তরিকতা ও আবেগমাখা বর্ণনা স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। তিনি প্রকৃতি, মানুষের অন্তর্দৃষ্টি এবং সমাজের নানা দিককে উদ্দীপনামূলক ও চিন্তাশীল কবিতার মাধ্যমে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন।

জাহানারা আরজু ও এ কে এম নুরুল ইসলামের চার সন্তান। বড় ছেলে মো. আশফাকুল ইসলাম হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি, ছোট ছেলে প্রকৌশলী মোহাম্মদ জাহিনুল ইসলাম। বড় মেয়ে অধ্যাপিকা মেরিনা জামান এবং ছোট মেয়ে প্রয়াত লুবনা জাহান। তিনি অসংখ্য গুণগ্রাহী, অনুরাগী ও শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে গেছেন, যারা তার সাহিত্যকর্ম ও মানবিক চরিত্রকে স্মরণে রাখবেন।

জাহানারা আরজুর মৃত্যু বাংলা সাহিত্যের এক যুগান্তকারী ক্ষতি। তাঁর সাহিত্যকর্ম নারী স্বাধীনতা, সামাজিক চেতনা এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতি নতুন আলো ছড়িয়েছে। তিনি শুধুমাত্র কবি নন, বরং সমাজ ও সংস্কৃতির অগ্রগামী নেত্রী হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর অবদান, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও কবিতার সৌন্দর্য পাঠক হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত