প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্ব অর্থনীতি আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগে সংঘাত কিছুটা থেমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে স্বস্তির আভাস মিলেছিল। তেল ও গ্যাস উৎপাদন স্বাভাবিক ছিল, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল অব্যাহত ছিল এবং জ্বালানি সরবরাহে বড় কোনো বিঘ্ন ঘটেনি। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে—এমন আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাম্প্রতিক বিমান হামলা এবং তার জবাবে বিভিন্ন স্থানে ইরানের পাল্টা আক্রমণে পরিস্থিতি আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম The New York Times-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক শক্তিধর দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হলে বিশ্ববাজারে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের কেন্দ্রবিন্দু। বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের উল্লেখযোগ্য অংশ এ অঞ্চল থেকে আসে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল পরিবাহিত হয়, যার বড় অংশ এশিয়ার শিল্পোন্নত অর্থনীতিগুলোতে পৌঁছে।
জ্বালানি সরবরাহে সামান্য বিঘ্নও বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। ইতোমধ্যে সংঘাতের খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এক দিনে প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে যায়, পরে কিছুটা কমলেও ওঠানামা অব্যাহত থাকে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের প্রতিফলন। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতের ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে খাদ্যপণ্যের দামেও, কারণ কৃষি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাও জ্বালানিনির্ভর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিকে আবারও উসকে দিতে পারে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদহার বাড়ানোর পথে হাঁটতে পারে। সুদহার বাড়লে বন্ধক ঋণ, গাড়ি ঋণ ও ব্যবসায়িক ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি পায়। ফলে ভোক্তারা ব্যয় কমাতে বাধ্য হন, বিনিয়োগ কমে যায় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়। দীর্ঘমেয়াদি এ প্রবণতা বিশ্ব অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও Harvard University-এর অধ্যাপক Kenneth Rogoff সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্ব এখন অত্যন্ত অনিশ্চিত সময় পার করছে। তিনি মনে করিয়ে দেন, ইতিহাসে বহু সংঘাত প্রথমে সীমিত মনে হলেও পরে তা বৃহৎ আকার ধারণ করেছে। তিনি Archduke Franz Ferdinand হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ১৯১৪ সালে অনেকে ধারণা করেছিলেন পরিস্থিতি দ্রুত শান্ত হবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়ে।
বর্তমান পরিস্থিতি ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। সে সময় সরবরাহ কমে গিয়ে বিশ্বব্যাপী মূল্যবৃদ্ধি ঘটে এবং বহু দেশ অর্থনৈতিক মন্দায় নিমজ্জিত হয়। তবে এখনকার প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। একাধিক তেল উৎপাদনকারী দেশ প্রয়োজনে উৎপাদন বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহ তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। তবুও ঝুঁকি পুরোপুরি কেটে যায়নি। যদি হরমুজ প্রণালি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় বা বড় কোনো শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সরবরাহ ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে।
জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে পেট্রোরসায়ন শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সার, প্লাস্টিক ও বিভিন্ন রাসায়নিক পণ্যের উৎপাদন কমে গেলে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এতে খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। সাব-সাহারান আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ ইতোমধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দিচ্ছে; নতুন করে জ্বালানির দাম বাড়লে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক Peterson Institute for International Economics-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো আদনান মাজারেই বলেছেন, ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতিগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ তারা আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। জার্মানি, ইতালি ও স্পেনের মতো দেশ ইতোমধ্যে বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনার চাপে রয়েছে। এর সঙ্গে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি যুক্ত হলে শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি আরও ব্যাহত হতে পারে।
চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো অর্থনীতিগুলোতেও চাপ বাড়তে পারে। চীন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। একই সময়ে দেশটি অভ্যন্তরীণ আবাসন খাতের সংকট মোকাবিলা করছে। জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি পেলে উৎপাদন খরচ বাড়বে এবং রপ্তানিযোগ্য পণ্যের প্রতিযোগিতা কমতে পারে। ভারতও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির চাপে পড়তে পারে।
তবে আশার দিকও রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কৌশলগত মজুত গঠন এবং বিকল্প সরবরাহপথ উন্নয়নের ফলে আগের তুলনায় কিছুটা স্থিতিস্থাপকতা তৈরি হয়েছে। ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ সৌর ও বায়ুশক্তিতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। তবুও পরিবহন ও ভারী শিল্প এখনো তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন না ঘটলেও অনিশ্চয়তার পরিবেশই বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার না হলে এবং সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব অর্থনীতি নতুন করে কঠিন চাপে পড়তে পারে।