প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আফ্রিকার দেশ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গো-এর বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত বৃহত্তম কোলটান খনি রুবায়ায় ভয়াবহ সুড়ঙ্গ ধসে অন্তত ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। বার্তাসংস্থা Agence France-Presse (এএফপি) গোমা থেকে এ তথ্য জানিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে তিনজন নারী ও তিনজন পুরুষ রয়েছেন। আরও কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন, যাদের স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
উত্তর কিভু প্রদেশের রাজধানী গোমা থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত রুবায়া খনির গাসাসা কোয়ারি এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সুড়ঙ্গের একটি অংশ হঠাৎ ধসে পড়ে। খনির ভেতরে তখন বহু শ্রমিক কাজ করছিলেন। ধসের সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং শুরু হয় উদ্ধার তৎপরতা।
গোমা থেকে ফোনে যোগাযোগ করা ড্যানিয়েল নামের এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, কয়েকজন মানুষ মারা গেছেন এবং অনেকে গুরুতর আহত। তিনি জানান, কর্তৃপক্ষ এলাকা খালি করার নির্দেশ দেওয়ার পর তিনি স্ট্রেচারে দুটি মরদেহ সরিয়ে নিতে দেখেছেন। আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তিন নারী ও তিন পুরুষসহ ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে দুর্ঘটনার পরপরই সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ বহু শ্রমিক তখনো খনির বিভিন্ন গহ্বরে অবস্থান করছিলেন।
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই বহু মানুষ তাদের স্বজনদের খোঁজে খনির দিকে ছুটে যান। খনির প্রবেশপথে কান্না, উৎকণ্ঠা আর অপেক্ষার দৃশ্য তৈরি হয়। স্থানীয় প্রশাসন ও খনি কর্তৃপক্ষ এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে এবং উদ্ধারকাজে নিয়োজিত দলকে সহায়তা দেয়।
রুবায়া খনি বৈশ্বিক কোলটান উৎপাদনের ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ সরবরাহ করে বলে আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা। কোলটান থেকে ট্যান্টালাম নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাতু পাওয়া যায়, যা স্মার্টফোন, ল্যাপটপসহ নানা ইলেকট্রনিক যন্ত্রে ব্যবহৃত হয়। ফলে এই খনির উৎপাদন শুধু স্থানীয় অর্থনীতিই নয়, বৈশ্বিক প্রযুক্তি শিল্পের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
তবে এই অর্থনৈতিক গুরুত্বের আড়ালে রয়েছে ভয়াবহ ঝুঁকি। রুবায়ার গহ্বরগুলোয় কয়েক হাজার খনি শ্রমিক অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করেন। অধিকাংশ শ্রমিকের কাছে আধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম নেই। সাধারণ কোদাল, হাতুড়ি এবং রাবারের বুট পরেই তারা গভীর সুড়ঙ্গে নেমে পড়েন। ভারী যন্ত্রপাতি, কাঠামোগত সহায়তা বা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাবে যেকোনো সময় ধসের আশঙ্কা থাকে।
২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে খনিটি এম২৩ বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পূর্ব কঙ্গোর দীর্ঘদিনের সংঘাত, বিদ্রোহী গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণের লড়াই এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রণের কারণে নিরাপত্তা ও তদারকির ঘাটতি আরও প্রকট হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় রুবায়ায় এটি দ্বিতীয় প্রাণঘাতী ধস। গত মাসের শেষ দিকে একই এলাকায় ভয়াবহ ভূমিধসে অন্তত ২০০ জন মারা গেছে বলে সরকার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল। সে ঘটনার পরও নিরাপত্তা জোরদারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি বলে শ্রমিকদের অভিযোগ।
বিশ্লেষকদের মতে, পূর্ব কঙ্গোর খনি অর্থনীতি একদিকে বিপুল সম্পদের উৎস, অন্যদিকে মানবিক বিপর্যয়ের ক্ষেত্র। দারিদ্র্যপীড়িত মানুষ জীবিকার তাগিদে জীবন ঝুঁকিতে ফেলে এসব খনিতে কাজ করেন। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ কর্মপরিবেশ, স্বচ্ছ বাণিজ্য ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব কমানোর দাবি জানিয়ে আসছে।
এই দুর্ঘটনা আবারও সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে—প্রাকৃতিক সম্পদের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কেন শ্রমিকদের জীবন এত অনিরাপদ? খনি খাত থেকে যে আয় আসে, তা কতটা শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কল্যাণে ব্যয় হয়?
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, ধসের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়েছে। আহতদের চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে এবং নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়েছে। তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, প্রকৃত পরিবর্তন আনতে হলে কেবল তদন্ত নয়, কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।
রুবায়ার অন্ধকার সুড়ঙ্গে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য প্রতিটি দিনই অনিশ্চয়তায় ভরা। মঙ্গলবারের এই ধস তাদের জীবনের ঝুঁকিকে আবারও স্পষ্ট করে তুলেছে। বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারে ব্যবহৃত একটি ধাতুর পেছনে যে মানবিক মূল্য লুকিয়ে আছে, এই দুর্ঘটনা সেই বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।