প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের পৃথক তালিকা প্রকাশ করে শিগগিরই বিশেষ অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং এ লক্ষ্যেই কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
বুধবার দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) হলরুমে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা। তিনি বলেন, যারা অবৈধ অস্ত্র বহন করে, সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত থাকে এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে—তাদের পৃথক তালিকা তৈরি করে যাচাই-বাছাই শেষে আইনের আওতায় আনা হবে।
মন্ত্রী বলেন, তালিকা প্রণয়নের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। মাঠপর্যায়ের তথ্য, গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং স্থানীয় প্রশাসনের সুপারিশের ভিত্তিতে নাম অন্তর্ভুক্ত করা হবে। যাচাই-বাছাই ছাড়া কাউকে তালিকাভুক্ত করা হবে না বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন। তার ভাষায়, “আমরা কাউকে হয়রানি করতে চাই না, তবে অপরাধীদের ছাড় দেওয়ার প্রশ্নও নেই।”
দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় শুধু আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। সচেতন নাগরিক সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অপরাধ সংক্রান্ত তথ্য গোপন না রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে তিনি আহ্বান জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিগত সরকারের সময় একটি ‘ফ্যাসিবাদী’ ব্যবস্থার কারণে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো পুলিশ বিভাগও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের দায় পুরো প্রতিষ্ঠানের ওপর এসে পড়েছিল। তবে বর্তমান সরকার পুলিশকে তাদের ঐতিহাসিক গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকায় ফিরিয়ে নিতে চায়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, পুলিশকে জনগণের বন্ধু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই সরকারের লক্ষ্য। কোনো ব্যক্তিতান্ত্রিক বা স্বৈরতান্ত্রিক নির্দেশনায় নয়, বরং আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্য দিয়েই পুলিশ পরিচালিত হবে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মন্ত্রণালয়ে ‘চেইন অব কমাণ্ড’ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, কোনো নিম্নপদস্থ কর্মকর্তা যেন যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সরাসরি ঊর্ধ্বতন স্তরে যোগাযোগ না করেন—সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে প্রয়োজনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যে কোনো স্তরের কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন। এতে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
রাজধানীর তীব্র যানজট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে একটি বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছে এবং ডিএমপি কমিশনারকে ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে এক সপ্তাহের মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়ে গেছে এবং ভিআইপি ও প্রধান সড়কগুলোতেও যেখানে নন-মোটরচালিত যান চলাচল নিষিদ্ধ থাকার কথা, সেখানে এসব যান চলাচল করছে।
পরীক্ষামূলকভাবে উত্তরা থেকে এয়ারপোর্ট রোড হয়ে সচিবালয়মুখী ভিআইপি সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশাসহ অননুমোদিত যান চলাচল সীমিত ও নিয়ন্ত্রণ করা হবে বলে জানান তিনি। পরবর্তীতে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সড়কেও একই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যানজটের পেছনে নাগরিকদের অসচেতন আচরণও দায়ী বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, অনেকেই ট্রাফিক সিগন্যাল মানেন না, বাম লেন খালি রাখার নিয়ম অনুসরণ করেন না। “আমরা নিজেরাই ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করি, তারপর যানজটের জন্য শুধু প্রশাসনকে দায়ী করি,”—বলেন তিনি। সচেতনতা বৃদ্ধি ও আইন মানার সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর জোর দেন মন্ত্রী।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। তাই আগের পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান সময়ের তুলনা করা সমীচীন নয়। সরকার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও আইনের শাসনকে শক্তিশালী করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত কর্মকর্তারা জানান, তালিকা প্রণয়ন ও বিশেষ অভিযানের প্রস্তুতি সমন্বিতভাবে এগিয়ে চলছে। মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মানবাধিকার ও আইনি প্রক্রিয়া মেনে অভিযান পরিচালনার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, পুলিশ ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় থাকবে এবং আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। তার ভাষায়, “অপরাধ দমনে আমরা কঠোর, কিন্তু ন্যায়বিচারে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে এই ঘোষণাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন নজর থাকবে—প্রকাশিত তালিকা ও ঘোষিত অভিযান কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়।