ইরানে ২ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে মার্কিন হামলা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৪ মার্চ, ২০২৬
  • ১২ বার
ইরানে ২ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা

প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনার পারদ চরমে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তারা ইরানের অভ্যন্তরে প্রায় দুই হাজার লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক সামরিক হামলা চালিয়েছে। ওয়াশিংটনের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক এই অভিযান ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের সময় পরিচালিত অভিযানের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ মাত্রার ছিল। ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক কূটনীতিতে এর প্রভাব নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা United States Central Command–এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই অভিযানে ৫০ হাজারের বেশি সেনা সদস্য, দুই শতাধিক যুদ্ধবিমান, দুটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার এবং কৌশলগত বোমারু বিমান অংশ নেয়। কমান্ডের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ইউএস নেভির সিনিয়র অ্যাডমিরাল Brad Cooper বলেন, এটি এই প্রজন্মে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক মোতায়েনের ঘটনা।

তিনি দাবি করেন, ইরানের ১৭টি জাহাজ ধ্বংস করা হয়েছে এবং পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালী ও ওমান সাগর এলাকায় ইরানি নৌবাহিনীর দৃশ্যমান উপস্থিতি নেই। তার ভাষায়, “আমরা সেসব লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছি যেখান থেকে আমাদের বাহিনী বা মিত্রদের ওপর হামলার আশঙ্কা ছিল। ইরানি নৌ সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ, এমনকি তাদের কার্যকর সাবমেরিনও আমাদের অভিযানের আওতায় এসেছে।”

তবে ইরানের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক পূর্ণাঙ্গ ক্ষয়ক্ষতির হিসাব প্রকাশ করা হয়নি। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম বলছে, কিছু সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রয়েছে। তেহরান এই হামলাকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়ে কড়া জবাবের হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের ব্যাপক সামরিক অভিযান শুধু দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনা নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে। পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট। এখানে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে তীব্র ওঠানামা সৃষ্টি করতে পারে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার আভাস দেখা গেছে।

২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে যে সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়েছিল, তা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছিল। এবার সেই অভিযানের তুলনায় দ্বিগুণ মাত্রার হামলার দাবি নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় আকারের সামরিক প্রস্তুতি কেবল প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ নয়, বরং একটি কৌশলগত বার্তা—যা ইরান ছাড়াও আঞ্চলিক অন্যান্য শক্তির প্রতি ইঙ্গিতবহ।

মানবিক দিক থেকেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার কথা বলা হলেও, বড় আকারের আকাশ ও নৌ অভিযান সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। ইরানের বিভিন্ন শহরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে। অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো সম্ভাব্য বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছে।

কূটনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে তৎপরতা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা পরিস্থিতি শান্ত করার আহ্বান জানিয়েছে। আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে কেউ কেউ মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও ভাবছে। কারণ, সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তা সিরিয়া, ইরাক, লেবানন ও ইয়েমেনের মতো দেশগুলোতেও নতুন করে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ৫০ হাজার সেনা, দুই শতাধিক যুদ্ধবিমান ও একাধিক এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের সমন্বয়ে পরিচালিত অভিযান কেবল তাৎক্ষণিক আঘাত নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত চাপ সৃষ্টির অংশ হতে পারে। এতে আকাশ, সমুদ্র ও সাইবার সক্ষমতার সমন্বিত ব্যবহার হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও এ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। প্রশাসন বলছে, হামলাগুলো ছিল আত্মরক্ষামূলক এবং সম্ভাব্য হুমকি প্রতিরোধে প্রয়োজনীয়। সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন, এত বড় আকারের সামরিক পদক্ষেপ কি কূটনৈতিক সমাধানের পথকে সংকুচিত করে দেবে না।

পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ইরান যদি পাল্টা জবাব দেয়, তবে সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে। আবার কূটনৈতিক আলোচনার পথও একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরালো উদ্যোগ হয়তো উত্তেজনা প্রশমনে ভূমিকা রাখতে পারে।

বর্তমান বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্য এক নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সামরিক শক্তির প্রদর্শন যেমন স্পষ্ট, তেমনি অনিশ্চয়তাও গভীর। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ভারসাম্য—সবকিছুই এখন এই উত্তেজনার ওপর নির্ভর করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত