হামলার জবাবেই পাল্টা আঘাত: ইরানের প্রেসিডেন্ট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ, ২০২৬
  • ১৮ বার
হামলার জবাবেই পাল্টা আঘাত: ইরানের প্রেসিডেন্ট

প্রকাশ: ৫ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে আবারও উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে যখন উদ্বেগ বাড়ছে, তখন ইরানের প্রেসিডেন্ট Masoud Pezeshkian বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর ইরানের সামনে পাল্টা আঘাত ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না। তার দাবি, তেহরান শুরু থেকেই কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল, কিন্তু পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছায় যেখানে প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া দেখানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না।

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ এই প্রেক্ষাপটে ইরানের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান কখনোই অঞ্চলটিকে অস্থিতিশীল করতে চায় না এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তাকে সবসময় সম্মান করে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো রাষ্ট্র যদি সরাসরি হামলার শিকার হয়, তাহলে আত্মরক্ষার অধিকার আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত। সেই অধিকার থেকেই ইরান তাদের সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় আকস্মিক বিমান হামলা চালায় United States ও Israel। এই হামলার পরপরই উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে। তেহরান অভিযোগ করে, তাদের পারমাণবিক স্থাপনা ও সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর দিকে পাল্টা হামলা চালায় বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।

ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, হামলার আগ পর্যন্ত তাদের সরকার বিভিন্ন কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা করেছিল। তিনি দাবি করেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষা এবং সংঘাত এড়াতে তেহরান একাধিকবার আলোচনার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভিন্ন দাবি করা হয়েছে। White House জানিয়েছে, হামলার আগে তেহরানকে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। প্রেস ব্রিফিংয়ে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র Caroline Leavitt বলেন, ইরানকে সংঘাত এড়াতে এবং উত্তেজনা কমাতে একাধিক কূটনৈতিক সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেসব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য হয়ে সামরিক অভিযান শুরু করে।

লেভিটের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রস্তাবগুলোর মধ্যে ছিল ইরানের ওপর থেকে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সম্ভাবনা, শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা এবং মার্কিন বিনিয়োগে একটি যৌথ বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি চালু করার উদ্যোগ। তবে এসব সুবিধার বিনিময়ে ইরানকে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অবকাঠামো স্থায়ীভাবে ধ্বংস করার শর্ত দেওয়া হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তেহরান সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় পরিস্থিতি সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়।

এই সংঘাতের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump। “অপারেশন এপিক ফিউরি” নামে পরিচিত এই সামরিক অভিযান নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ওয়াশিংটনের বক্তব্য অনুযায়ী, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তারা আশঙ্কা করেছিল যে ইরান ভবিষ্যতে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করতে পারে। সেই সম্ভাব্য হুমকি ঠেকাতেই আগাম পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী, ইসরাইলি গোয়েন্দা তথ্যও এই অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। Benjamin Netanyahu সরকারের পক্ষ থেকে সরবরাহ করা তথ্যের ভিত্তিতেই ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় বলে জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা Ali Khamenei–এর অবস্থান নিয়েও আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা মহলে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলো এখনো সরাসরি সংঘাতে জড়াতে অনিচ্ছুক। বিশেষ করে Germany স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে তারা এই সংঘাতে কোনো পক্ষের হয়ে সামরিকভাবে অংশ নেবে না। জার্মান প্রতিরক্ষা মন্ত্রী Boris Pistorius বলেন, বর্তমান সংকট অত্যন্ত জটিল এবং কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে এর সমাধান সম্ভব নয়। তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে আবারও কূটনৈতিক আলোচনার পথেই ফিরতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে এই নতুন উত্তেজনা কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে যে কোনো সামরিক সংঘাত দ্রুতই বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকায় পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।

এছাড়া পারমাণবিক ইস্যুও এই সংঘাতের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মহল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। তেহরান অবশ্য দাবি করে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ বেসামরিক কাজে ব্যবহারের জন্যই এই কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আশঙ্কা, এই কর্মসূচির আড়ালে ইরান ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশও বর্তমান পরিস্থিতি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

এমন প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ আবারও কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ইতোমধ্যে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কূটনীতিকদের মতে, উত্তেজনা দ্রুত কমাতে পারলে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত এড়ানো সম্ভব হতে পারে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানও শেষ পর্যন্ত আলোচনার পথ খোলা রাখার কথা বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ইরান সংঘাত চায় না, বরং সম্মানজনক ও ন্যায্য সমাধানের মাধ্যমে আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখতে আগ্রহী। তবে একইসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে ইরান কখনোই আপস করবে না।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপের দিকে। সংঘাত কি আরও বিস্তৃত হবে, নাকি আবার আলোচনার টেবিলে ফিরে আসবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো—সেই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার গতিপথ

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত