প্রকাশ: ৫ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দিন দিন বাড়ছে। ইরানকে ঘিরে চলমান সামরিক উত্তেজনা এবং পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। জ্বালানি বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা Reuters–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বৃহস্পতিবার বিশ্ববাজারে Brent Crude Oil–এর দাম ব্যারেলপ্রতি ১.৬৭ ডলার বা প্রায় ২.০৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ দশমিক ০৭ ডলারে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ডের তেল West Texas Intermediate–এর দামও ১ দশমিক ৯৪ ডলার বা ২ দশমিক ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৬ দশমিক ৬০ ডলারে পৌঁছেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণ হচ্ছে পারস্য উপসাগরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ Strait of Hormuz–এ জাহাজ চলাচলের বড় ধরনের বিঘ্ন। বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত জ্বালানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। কিন্তু ইরানকে কেন্দ্র করে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার পর টানা কয়েকদিন ধরে এই পথে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে রয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে Iran–কে ঘিরে চলমান সামরিক সংঘাত। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে United States এবং Israel–এর সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর তেহরানও পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। এই সংঘাতের প্রভাব সরাসরি পড়ছে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি উৎপাদন ও পরিবহন ব্যবস্থায়।
এদিকে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদক দেশগুলোর উৎপাদন সমস্যার কারণে। কর্মকর্তাদের মতে, বিশ্বের অন্যতম বড় তেল উৎপাদক Iraq বর্তমানে সংরক্ষণাগার ও রফতানি রুটের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিদিন প্রায় ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল কম উৎপাদন করছে। এই উৎপাদন ঘাটতি আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিচ্ছে এবং দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুধু তেলই নয়, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ এলএনজি উৎপাদক Qatar জানিয়েছে, চলমান পরিস্থিতির কারণে তাদের উৎপাদন স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরতে অন্তত এক মাস সময় লাগতে পারে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
সমুদ্রপথে তেল পরিবহনের ক্ষেত্রেও নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কুয়েতের উপকূলের কাছে একটি তেলবাহী জাহাজের কাছাকাছি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে এবং সন্দেহজনক একটি ছোট জাহাজকে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করতে দেখা গেছে। ঘটনাটি ঘটেছে কুয়েতের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর এলাকা Mubarak Al Kabeer Port–এর নিকটে, যা আন্তর্জাতিক তেল পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র।
বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান JPMorgan Chase জানিয়েছে, এখনো পর্যন্ত ইরান সরাসরি বড় জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়নি। তবে উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে পারস্য উপসাগরে প্রায় ৩২৯টি তেলবাহী জাহাজ বিভিন্ন কারণে আটকে রয়েছে, যা সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও সংকটে ফেলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি উৎপাদন অনেকাংশে নির্ভর করে Gulf Cooperation Council–এর সদস্য দেশগুলোর ওপর। এই জোটের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে রয়েছে Saudi Arabia, United Arab Emirates, Qatar, Kuwait, Oman এবং Bahrain। এসব দেশের তেল উৎপাদন ও সংরক্ষণ সক্ষমতা বর্তমান সংকট কতটা দীর্ঘায়িত হবে, তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জ্বালানি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি সংঘাত সীমিত থাকে এবং তেলক্ষেত্রগুলোতে বড় ধরনের ক্ষতি না হয়, তাহলে বেশিরভাগ উৎপাদন কয়েক দিনের মধ্যে পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে। সাধারণত দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে উৎপাদন পূর্ণ ক্ষমতায় ফিরে আসে। তবে বিশেষ করে ইরাকের মতো দেশে জলাধারের চাপ পুনর্গঠন এবং উৎপাদন স্বাভাবিক করতে আরও সময় লাগতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ। যুক্তরাষ্ট্রের University of Houston–এর জ্বালানি অর্থনীতিবিদ Ed Hirs আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের অর্ধেকও বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তার মতে, এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করা ট্যাংকারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যেই তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারে এর প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। সংঘাত শুরুর প্রথম দিনেই এলএনজির দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে যায়। এরপর মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়।
ডিজেলসহ অন্যান্য জ্বালানির দামও দ্রুত বাড়ছে। হির্সের মতে, অনেক গ্যাসনির্ভর দেশ এখন বিকল্প হিসেবে বিপুল পরিমাণ পেট্রোলিয়াম মজুত করতে শুরু করেছে। ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির চাহিদা আরও বেড়ে যাচ্ছে এবং বাজারে চাপ তৈরি করছে।
এই সংকটের সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঞ্চলে জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে তা দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে New England অঞ্চলের অঙ্গরাজ্যগুলোতে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব বেশি পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানির দাম যদি সত্যিই ১৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তাহলে তা শুধু জ্বালানি বাজারেই নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতে প্রভাব ফেলবে। পরিবহন ব্যয় বাড়বে, উৎপাদন খরচ বাড়বে এবং অনেক দেশে মূল্যস্ফীতি নতুন করে বাড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে সরকার ও অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকরা গভীর উদ্বেগ নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। অনেক দেশই ইতোমধ্যে বিকল্প জ্বালানি উৎস এবং কৌশলগত মজুত ব্যবহারের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন একটাই—মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনা কতদিন স্থায়ী হবে। কারণ সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, ততই জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়বে এবং তার প্রভাব পড়বে বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।