প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের কৃষকদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্যে একটি নতুন উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩ উপলক্ষে আগামী ১৪ এপ্রিল পরীক্ষামূলকভাবে ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কৃষকদের জন্য বিভিন্ন সরকারি সহায়তা, ভর্তুকি ও আধুনিক কৃষিসেবাকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্যেই এই কর্মসূচি চালু করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কৃষক কার্ড চালু হলে দেশের কৃষি খাতের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় নতুন একটি যুগের সূচনা হবে এবং কৃষকের অধিকার ও সুবিধা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গতকাল বুধবার রাজধানীর সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক পর্যালোচনা সভায় এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রস্তুতি ও রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় কৃষি খাতের উন্নয়ন, কৃষকদের আর্থিক নিরাপত্তা এবং কৃষি ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকতা আনার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। বৈঠকে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত থেকে কৃষক কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে মতামত দেন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব সালেহ শিবলী গণমাধ্যমকে জানান, কর্মসূচিটি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অর্থ সচিবের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি সচিব কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি কৃষক কার্ড কর্মসূচির সার্বিক তদারকি, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত নির্দেশনা প্রদান করবে। তিনি জানান, কৃষকদের একটি নির্ভরযোগ্য ও আধুনিক ডাটাবেজ তৈরির মাধ্যমে ভবিষ্যতে কৃষি খাতে সরকারি সহায়তা আরও সহজ ও স্বচ্ছভাবে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
পর্যালোচনা সভায় কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ, কৃষি প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে কৃষি খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ, কৃষকদের আর্থিক সুরক্ষা এবং উৎপাদন বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা হয়। কর্মকর্তারা জানান, কৃষক কার্ড চালু হলে কৃষকদের পরিচয় ও তথ্য একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষিত থাকবে, যা ভবিষ্যতে বিভিন্ন সহায়তা প্রদান সহজ করবে।
প্রেসসচিব সালেহ শিবলী বলেন, কৃষক কার্ড শুধু একটি পরিচয়পত্র নয়; এটি দেশের প্রতিটি কৃষকের ন্যায্য অধিকার, মর্যাদা এবং নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হবে। তিনি জানান, এই কার্ডের মাধ্যমে ধাপে ধাপে কৃষকদের বিভিন্ন সরকারি সেবা প্রদান করা হবে এবং কৃষি খাতে সরকারি সহায়তার বণ্টন আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর হবে।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ সংগ্রহ করতে পারবেন। পাশাপাশি সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা গ্রহণের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী সুবিধা পাওয়া, ন্যায্যমূল্যে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা এবং সহজ শর্তে কৃষিঋণ পাওয়ার সুযোগও কৃষক কার্ডের মাধ্যমে দেওয়া হবে। এছাড়া কৃষকদের জন্য কৃষি বীমা সুবিধা, ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রির সুযোগ এবং আধুনিক কৃষি প্রশিক্ষণ প্রদান করার ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে।
এছাড়া ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় কৃষকদের জন্য আবহাওয়া ও বাজারসংক্রান্ত তথ্য সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষকরা মোবাইল বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ফসলের রোগবালাই ও পোকামাকড় দমনের পরামর্শও পাবেন। ফলে কৃষি উৎপাদনে ঝুঁকি কমবে এবং কৃষকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই কর্মসূচি শুধু শস্য উৎপাদনকারী কৃষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। মৎস্যচাষি, প্রাণিসম্পদ খামারি এবং দুগ্ধ খামারিরাও কৃষক কার্ডের আওতায় আসবেন। ফলে কৃষি ও সংশ্লিষ্ট খাতের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী এই কর্মসূচির মাধ্যমে সরাসরি উপকৃত হবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কৃষি অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন খাতকে একই প্ল্যাটফর্মে আনার মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
প্রেসসচিব জানান, প্রাক-পাইলট পর্যায়ে আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে দেশের বিভিন্ন শ্রেণির কৃষকের তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এরপর দেশের আটটি বিভাগের নয়টি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে কৃষক কার্ড বিতরণ করা হবে। নির্বাচিত উপজেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে টাঙ্গাইল সদর, বগুড়ার শিবগঞ্জ, পঞ্চগড় সদর, জামালপুরের ইসলামপুর, ঝিনাইদহের শৈলকুপা, পিরোজপুরের নেছারাবাদ, মৌলভীবাজারের জুড়ী, কুমিল্লা সদর এবং কক্সবাজারের টেকনাফ।
এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে। সংস্থাটি মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের তথ্য সংগ্রহ, যাচাই এবং কার্ড বিতরণের কার্যক্রম পরিচালনা করবে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তথ্যভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে এই ডাটাবেজ ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
কৃষক কার্ড কর্মসূচির আওতায় ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকেরা গড়ে প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকা করে ভর্তুকি বা কৃষি উপকরণ সহায়তা পাবেন। এছাড়া খরিফ-১ ও খরিফ-২ মৌসুমে নির্দিষ্ট শ্রেণির কৃষকদের জন্য সরকার নির্ধারিত হারে আর্থিক অনুদান প্রদান করা হবে। এতে কৃষকদের উৎপাদন খরচ কিছুটা কমবে এবং তারা উৎপাদন বৃদ্ধিতে আরও উৎসাহিত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কৃষক কার্ড চালু হলে কৃষকদের তথ্যভিত্তিক সহায়তা প্রদান সহজ হবে এবং কৃষি খাতে নীতিনির্ধারণ আরও কার্যকর হবে। একই সঙ্গে কৃষকদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়বে এবং ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে তাদের সংযোগও শক্তিশালী হবে।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রাক-পাইলট ও পাইলট পর্যায়ের কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হলে আগামী চার বছরের মধ্যে দেশের সব উপজেলায় কৃষক কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কৃষকদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এবং দেশের কৃষি খাত আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে।
বিশ্লেষকদের মতে, কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত। তাই কৃষকদের জন্য একটি সমন্বিত পরিচয় ও সহায়তা ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষি খাতের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব। কৃষক কার্ড কর্মসূচি সেই লক্ষ্য পূরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।