প্রকাশ: ৬ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে সামনে রেখে দেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যথাযথ গুরুত্ব, মর্যাদা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে আগামী ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপনের লক্ষ্যে দেশের সব তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে পৃথক দুটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক Bangladesh Bank।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি)-১ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ (ডিএফআইএম) এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যাংকিং খাতেও আন্তর্জাতিক নারী দিবস যথাযথভাবে পালন করা প্রয়োজন। কারণ দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে এবং এ বাস্তবতায় আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বও বেড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপনের জাতীয় কর্মসূচি পরিচালনা করছে Ministry of Women and Children Affairs। এই মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দিবসটি উপলক্ষে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করছে। সেই ধারাবাহিকতায় দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দিবসটি অর্থবহভাবে পালন করতে বলা হয়েছে।
চলতি বছর আন্তর্জাতিক নারী দিবসের জন্য সরকার নির্ধারণ করেছে একটি বিশেষ প্রতিপাদ্য—“আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার, সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার”। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্দেশ দিয়েছে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সব ধরনের প্রচার, সচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং সামাজিক কার্যক্রমে এই প্রতিপাদ্যকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে হবে। ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা ও কার্যালয়ে ব্যানার, পোস্টার, আলোচনা সভা, সেমিনার বা অন্যান্য কার্যক্রমের মাধ্যমে নারী অধিকার ও সমতার বার্তা প্রচারের ওপর গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অর্থনীতির মূলধারায় নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় অংশগ্রহণ এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তা বড় ভূমিকা পালন করে। এ কারণে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে ব্যাংকিং খাতে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নারী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতা বলে এ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এই আইনের অধীনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিতে পারে এবং সেসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা ব্যাংকগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক। এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চায়, ব্যাংকিং খাত সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব পালনে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করুক।
একই সঙ্গে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও পৃথক বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ (ডিএফআইএম) জানিয়েছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন, ২০২৩-এর ৪১(২)(ঘ) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। ফলে ব্যাংকের পাশাপাশি লিজিং কোম্পানি, নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানকেও আন্তর্জাতিক নারী দিবস যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, নির্দেশনাগুলো দেশের সব তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তারা যেন নিজেদের প্রতিষ্ঠান ও শাখাগুলোতে দিবসটি উদযাপনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন এবং নারী অধিকার ও সমতার বার্তা ছড়িয়ে দিতে কার্যকর উদ্যোগ নেন।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় নারীর অবদান ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। পোশাক শিল্প, কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কার্যক্রম, প্রযুক্তি খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতেও নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। তবে এখনও অর্থনৈতিক সুযোগ ও আর্থিক সেবায় প্রবেশাধিকার নিয়ে অনেক ক্ষেত্রে নারীরা নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। সেই বাস্তবতায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগ নারী ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বড় সহায়ক হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরেই নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে বিভিন্ন নীতি ও কর্মসূচি গ্রহণ করে আসছে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধা, সহজ শর্তে অর্থায়ন এবং প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে অনেক নারী নতুন ব্যবসা শুরু করতে সক্ষম হয়েছেন এবং অর্থনীতিতে তাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, আন্তর্জাতিক নারী দিবসের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিনকে কেন্দ্র করে যদি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে, তাহলে তা সমাজে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এটি অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে।
এদিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস বিশ্বের বহু দেশে নানা আয়োজনে উদযাপিত হয়। নারীর অধিকার, সমতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই প্রতি বছর ৮ মার্চ দিনটি পালন করা হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও দিনটি গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হয় এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নারীর ক্ষমতায়ন শুধু সামাজিক ন্যায্যতার প্রশ্ন নয়, এটি অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। যখন নারীরা শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং আর্থিক সেবায় সমান সুযোগ পান, তখন একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। এ কারণেই আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনার মাধ্যমে এবার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নারী দিবস উদযাপনে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। এর মাধ্যমে শুধু একটি দিবস উদযাপন নয়, বরং নারী অধিকার, সমতা এবং ক্ষমতায়নের বার্তা সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যই গুরুত্ব পাচ্ছে।