প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর তুরাগ এলাকার কামারপাড়ায় ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে ভয়াবহ এক দুর্ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। একটি আবাসিক ভবনের দ্বিতীয় তলার বাসায় জমে থাকা গ্যাস থেকে বিস্ফোরণ ও আগুনের ঘটনায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ১০ জন দগ্ধ হয়েছেন। আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে তাদের চিকিৎসা চলছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাটিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছেন।
শুক্রবার (৬ মার্চ) ভোরের দিকে তুরাগের ১০ নম্বর সেক্টরের কবরস্থান রোডের মেম্বার বাড়ির পাশে অবস্থিত আবুল কালামের একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভোরের দিকে হঠাৎ করেই একটি বিকট শব্দ শোনা যায়। মুহূর্তের মধ্যেই বাসার ভেতর থেকে আগুনের লেলিহান শিখা বের হতে দেখা যায়। বিস্ফোরণের শব্দে আশপাশের বাসিন্দারা ঘুম থেকে জেগে ওঠেন এবং আতঙ্কিত হয়ে ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে যান।
দুর্ঘটনায় দগ্ধদের মধ্যে রয়েছেন রুবেল (৩০), তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী সোনিয়া আক্তার (২৫), তাদের ছোট মেয়ে রোজা (৩), সোনিয়ার বড় বোন রিয়া (২৭), রুবেলের চাচাতো ভাই এনায়েত (৩২), এনায়েতের স্ত্রী দেলেরা (২৮), তাদের ছেলে জুনায়েদ (১০), এনায়েতের ছোট ভাই হাবিব (৩০), এনায়েতের ভাগনি আয়েশা (১৯) এবং আরেকজন রুবেল (৩৫)। সবাই একই পরিবারের সদস্য বা আত্মীয়স্বজন বলে জানা গেছে। দুর্ঘটনার সময় তারা সবাই ওই বাসায় অবস্থান করছিলেন।
ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত এগিয়ে এসে আহতদের উদ্ধারে সহায়তা করেন। অনেকেই পানি এনে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। পরে আহতদের দ্রুত রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়। সেখানে তাদের জরুরি চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
তুরাগ থানার ডিউটি অফিসার জানিয়েছেন, খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং স্থানীয়দের সহায়তায় দগ্ধদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে যে গ্যাস সিলিন্ডারের পাইপ লিক হয়ে বাসার ভেতরে গ্যাস জমে ছিল। ভোরের দিকে রান্নাঘরে আগুন ধরানোর সময় বা কোনো ধরনের স্পার্ক থেকে হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। তবে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার পর পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে আসেন। বিস্ফোরণের শব্দ এতটাই তীব্র ছিল যে আশপাশের কয়েকটি বাড়ির জানালার কাচ কেঁপে ওঠে। কেউ কেউ জানান, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল। বাসার ভেতরে থাকা লোকজন চিৎকার করে সাহায্য চাইছিলেন। সেই আর্তনাদ শুনে প্রতিবেশীরা দ্রুত এগিয়ে যান।
দগ্ধদের মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও ছোট শিশুর উপস্থিতি ঘটনাটিকে আরও হৃদয়বিদারক করে তুলেছে। হাসপাতালে নেওয়ার সময় অনেকের শরীরের বিভিন্ন অংশ মারাত্মকভাবে পুড়ে যায়। জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা তাৎক্ষণিকভাবে তাদের চিকিৎসা শুরু করেন।
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন ডা. শাওন বিন রহমান জানিয়েছেন, তাদের হাসপাতালে মোট ১০ জন দগ্ধ অবস্থায় আনা হয়েছে। তারা সবাই বর্তমানে জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন। দগ্ধদের শরীরের বিভিন্ন অংশে আগুনে পোড়া ক্ষত রয়েছে এবং চিকিৎসকরা তাদের অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
তিনি আরও জানান, এ ধরনের দুর্ঘটনায় দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আগুনে দগ্ধ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা রোগীর চিকিৎসা এবং শারীরিক অবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হয়। দগ্ধদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং তাদের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা কাজ করছেন।
স্থানীয়দের অনেকেই জানিয়েছেন, আবাসিক এলাকায় গ্যাস লিক বা জমে থাকার বিষয়টি অনেক সময়ই মানুষ গুরুত্ব দেন না। কিন্তু সামান্য অসতর্কতাই বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে সিলিন্ডারের পাইপ বা সংযোগস্থলে লিক থাকলে তা থেকে ধীরে ধীরে গ্যাস জমে গিয়ে বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রান্নাঘরে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করার ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা মেনে চলা জরুরি। নিয়মিত পাইপ ও সংযোগস্থল পরীক্ষা করা, গ্যাসের গন্ধ পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে দরজা-জানালা খুলে দেওয়া এবং আগুন বা বৈদ্যুতিক সুইচ ব্যবহার না করা—এসব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে জমে থাকা গ্যাস মুহূর্তের মধ্যেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
তুরাগের কামারপাড়া এলাকাটি ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত। এখানে বহু পরিবার একই ভবনে বসবাস করে। ফলে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে তা দ্রুত বড় আকার ধারণ করতে পারে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার পর অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং কিছু সময়ের জন্য এলাকায় এক ধরনের ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
এদিকে দুর্ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তারা বাসাটির ভেতরের অবস্থা পরীক্ষা করে দেখছেন এবং কীভাবে গ্যাস জমে বিস্ফোরণ ঘটল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হলে প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই দুর্ঘটনা এলাকাবাসীকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। আহতদের পরিবার-স্বজন ও প্রতিবেশীরা হাসপাতালে ছুটে গেছেন। অনেকেই তাদের দ্রুত সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করছেন।
রাজধানীতে গ্যাস সংক্রান্ত দুর্ঘটনার ঘটনা নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন সময় জমে থাকা গ্যাস থেকে বিস্ফোরণ ও আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। তাই বিশেষজ্ঞরা বারবার সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছেন। তারা মনে করেন, সামান্য সতর্কতা এবং নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা এ ধরনের দুর্ঘটনা অনেকাংশে প্রতিরোধ করতে পারে।
এই দুর্ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও গ্যাস ব্যবহারে সতর্কতা বিষয়ে মানুষকে সচেতন করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন। কারণ একটি অসাবধানতা শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো একটি এলাকার মানুষের জন্য বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
ভোরের শান্ত পরিবেশে ঘটে যাওয়া এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে—বাসাবাড়িতে গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রে সামান্য অবহেলাও বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এখন সবার প্রার্থনা, দগ্ধদের দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠা এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা থেকে সবাই যেন শিক্ষা নেয়।