প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের ব্যাংকিং খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের বড় অংশই দুই বিভাগে কেন্দ্রীভূত—ঢাকা ও চট্টগ্রাম। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী দেশের মোট ব্যাংকঋণের প্রায় ৮৭ শতাংশই এই দুই বিভাগে বিতরণ হয়েছে। ফলে দেশের অন্যান্য বিভাগ তুলনামূলকভাবে ঋণ ও বিনিয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও গভীর হতে পারে এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেশের ব্যাংক খাতের ঋণ বিতরণের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৭৭ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা। তিন মাস আগে অর্থাৎ সেপ্টেম্বর শেষে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৪১ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা। সে হিসাবে তিন মাসের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৩৫ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণের পরিমাণ বাড়লেও এর বণ্টন কাঠামো এখনো ভারসাম্যপূর্ণ নয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে ঢাকা বিভাগেই ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের বড় অংশ কেন্দ্রীভূত রয়েছে। ডিসেম্বর শেষে ঢাকা বিভাগে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৯৬ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা, যা দেশের মোট ঋণের প্রায় ৬৭.৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি ব্যাংকঋণ শুধু এই একটি বিভাগেই রয়েছে।
তিন মাস আগে সেপ্টেম্বর শেষে ঢাকা বিভাগে ঋণের পরিমাণ ছিল ১১ লাখ ৭৬ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আগের প্রান্তিকের তুলনায় ডিসেম্বর শেষে ঢাকা বিভাগে ঋণ বিতরণ কিছুটা কমেছে। যদিও সামগ্রিকভাবে দেশের মোট ঋণ বাড়লেও ঢাকাকেন্দ্রিক ঋণ বিতরণে সামান্য সমন্বয় লক্ষ্য করা গেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ। দেশের অন্যতম প্রধান বন্দরনগরী ও শিল্পকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই বিভাগেও ব্যাংকঋণের বড় অংশ কেন্দ্রীভূত রয়েছে। ডিসেম্বর শেষে চট্টগ্রাম বিভাগে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৪৪ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা। এটি দেশের মোট ঋণের প্রায় ১৯.৪০ শতাংশ।
এর আগে সেপ্টেম্বর শেষে এই বিভাগে ঋণের পরিমাণ ছিল তিন লাখ ৩৮ হাজার ৪৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে চট্টগ্রাম বিভাগে ঋণ বিতরণে কিছুটা বৃদ্ধি দেখা গেছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, শিল্পকারখানা, আমদানি-রপ্তানি এবং বন্দরভিত্তিক ব্যবসা কার্যক্রমের কারণে এই বিভাগে ব্যাংকঋণের চাহিদা তুলনামূলকভাবে বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা ও চট্টগ্রাম মিলিয়ে দেশের মোট ব্যাংকঋণের প্রায় ৮৭ শতাংশ এই দুই বিভাগে কেন্দ্রীভূত। ফলে বাকি ছয়টি বিভাগে মাত্র ১৩ শতাংশ ঋণ বিতরণ হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এ ধরনের ঋণ বণ্টন কাঠামো দেশের আঞ্চলিক উন্নয়নে বড় ধরনের অসমতা তৈরি করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, অন্যান্য বিভাগে ঋণ বিতরণের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ডিসেম্বর শেষে খুলনা বিভাগে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৬ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৩.৭৪ শতাংশ। একই সময়ে রাজশাহী বিভাগে ঋণের পরিমাণ ছিল ৬৬ হাজার ৬৩ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৩.৭২ শতাংশ।
উত্তরাঞ্চলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল রংপুর বিভাগেও ব্যাংকঋণের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। ডিসেম্বর শেষে এই বিভাগে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪১ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ২.৩৫ শতাংশ।
ময়মনসিংহ বিভাগে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ১.২৮ শতাংশ। বরিশাল বিভাগে ঋণের পরিমাণ ১৯ হাজার ৬০২ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ১.১০ শতাংশ। আর সিলেট বিভাগে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ২৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ১ শতাংশের কিছু বেশি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিসংখ্যান দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে। অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং করপোরেট অফিস ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক হওয়ায় ব্যাংকঋণও স্বাভাবিকভাবেই ওই অঞ্চলগুলোতে বেশি কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। ফলে অন্য বিভাগগুলোতে শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের গতি তুলনামূলকভাবে ধীর হয়ে পড়ছে।
খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ব্যাংকঋণের বড় অংশ যখন একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হয়, তখন সেই অঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দ্রুত বাড়ে। কিন্তু একই সময়ে অন্যান্য অঞ্চলে বিনিয়োগের ঘাটতি তৈরি হয়। এর ফলে আঞ্চলিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে প্রভাবিত করতে পারে।
তারা আরও বলছেন, ব্যাংকঋণের বড় অংশ ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় বেশিরভাগ আর্থিক কার্যক্রম, এমনকি ব্যাংক খাতের অনিয়ম ও জালিয়াতির ঘটনাও এই অঞ্চলেই বেশি ঘটে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর নতুন শাখা খোলা, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং বড় করপোরেট লেনদেনের বেশিরভাগই ঢাকা ও চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, দেশের অন্যান্য বিভাগে শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ বাড়াতে হলে সেখানে ব্যাংকঋণের প্রবাহও বাড়াতে হবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আঞ্চলিক শিল্পাঞ্চল ও অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগও জোরদার করতে হবে।
এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন সময় ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে যাতে তারা অন্যান্য বিভাগে ঋণ বিতরণ বাড়ায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থায়নে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে কয়েকটি বিশেষ কর্মসূচিও চালু রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নির্দেশনা দিয়ে নয়, বাস্তবায়ন পর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় দেশের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে দুই-তিনটি অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। এতে আঞ্চলিক উন্নয়নের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের সুযোগও অসমভাবে বণ্টিত হবে।
তারা মনে করেন, সারা দেশে সমানভাবে শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ব্যাংকঋণ বিতরণের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকার উদ্যোক্তারা নতুন করে ব্যবসা শুরু করার সুযোগ পাবেন, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
বর্তমান পরিস্থিতি তাই অর্থনীতিবিদদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে—দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হলে ব্যাংকঋণের বণ্টন কাঠামোতে ভারসাম্য আনা জরুরি। আর সেই ভারসাম্য নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।