প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি সহযোগী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনার রহস্যজনক ও বর্বর হত্যাকাণ্ড পুরো শিক্ষা সম্প্রদায় এবং স্থানীয় জনগণকে শোকস্তব্ধ করেছে। বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের অফিসে অফিস সহায়ক (অস্থায়ী) ফজলুর রহমানের ছুরিকাঘাতে নিহত হন আসমা। ময়নাতদন্তে জানা গেছে, তাঁর শরীরে মোট ১৮ থেকে ২০টি আঘাতের চিহ্ন রয়েছে, যার মধ্যে কিছু গভীর ক্ষত গলায় এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে দেখা গেছে।
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. হোসেন ইমাম জানিয়েছেন, আসমাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। বিশেষত ডান গলার পাশে গভীর ক্ষত দেখা গেছে, যা রক্ত জমাট বাঁধার সঙ্গে ছিল। বাঁ পাশেও আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। গলায় সরাসরি ছুরি চালানোর কারণে আহতদের চরম বিপদে ফেলা হয়েছে। এই তথ্য দিয়ে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত এবং আক্রমণ অত্যন্ত হিংসাত্মক ছিল।
গত বৃহস্পতিবার সকালে আসমার লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। শহরের কোর্টপাড়ার বাসায় লাশ আনা হলে স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। আসমার বাবা শফিকুল ইসলাম জানান, তার পরিবারের বড় ক্ষতি হয়েছে এবং তিনি চেয়েছেন, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।
এই হত্যার ঘটনায় আসমার স্বামী ইমতিয়াজ সুলতান বৃহস্পতিবার সকালে থানায় চারজনকে আসামি করে মামলা করেছেন। মামলার আসামির মধ্যে রয়েছে অফিস সহায়ক ফজলুর রহমান, সমাজকল্যাণ বিভাগের সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস, সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার এবং সহকারী অধ্যাপক হাবিবুর রহমান। হত্যার ঘটনার সময় ফজলুর নিজের গলাতেও ছুরি চালানোর চেষ্টা করেছিলেন। শ্বাসনালীর আঘাতের কারণে তিনি কথা বলতে না পারলেও লিখে তার বক্তব্য পুলিশের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার ওসি মাসুদ রানা বলেন, “আসমা হত্যার ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। তদন্ত চলছে। প্রাথমিকভাবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্লু পাওয়া গেছে। আশা করছি তদন্তে সব তথ্য পরিষ্কার হবে।” কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার জসীম উদ্দীনও জানিয়েছেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।
বৃহস্পতিবার বড় ঈদগাহ ময়দানে জোহরের নামাজের পর আসমার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শিক্ষার্থী, সহকর্মী এবং এলাকার সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন। পরে আসমার লাশ পৌর গোরস্তানে দাফন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীরা হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রশাসন ভবনের সামনে বিক্ষোভ করেছেন এবং হত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
ফজলুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে আসমার অধীনে অস্থায়ী অফিস সহায়ক হিসেবে কাজ করতেন। নিয়মিত বেতন না পাওয়ায় তিনি হতাশ ছিলেন। আসমার সঙ্গে ঝামেলার কারণে তাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে স্থানান্তর করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগত রাগ ও ক্ষোভ থেকেই ফজলুর রহমান এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। ঘটনার পর তিনি নিজেও গুরুতর আহত হয়েছিলেন।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদও এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা জানিয়েছেন, শিক্ষাঙ্গনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষিকাদের প্রতি হামলা শুধু ব্যক্তি জীবন নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেও বিপন্ন করে। তারা সরকারের কাছে দ্রুত ও সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
ঘটনাটি কেবল কুষ্টিয়ায় নয়, পুরো দেশের শিক্ষা সম্প্রদায়ে শোক এবং উদ্বেগ তৈরি করেছে। সমাজকল্যাণ বিভাগের শিক্ষার্থীরা গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং এই ধরনের হত্যাকাণ্ড পুনরায় ঘটানো রোধে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর দায়িত্ব হলো দ্রুততার সঙ্গে তদন্ত সম্পন্ন করা এবং শিক্ষাক্ষেত্রে নিরাপত্তা জোরদার করা।
আসমা সাদিয়া রুনার এই হত্যাকাণ্ড শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক এবং দুঃখ সৃষ্টি করেছে। তারা আশা করছেন, দায়ীদের দ্রুত শনাক্ত করে শাস্তি প্রদান করা হবে। ঘটনার প্রভাব শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষকে সতর্ক করেছে যে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।