প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
হাজারো মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ আবারও গণতন্ত্রের ধারায় ফিরে এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি বলেছেন, এই আত্মত্যাগের মূল্য তখনই সার্থক হবে যখন দেশকে জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ করে একটি স্বনির্ভর ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করা যাবে। একই সঙ্গে তিনি দেশের পাটশিল্পকে আরও এগিয়ে নিতে কৃষক, উদ্যোক্তা ও তরুণ প্রজন্মকে নতুন উদ্ভাবন ও উদ্যোগে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
শুক্রবার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জাতীয় পাট দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। তিনি অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন এবং পাট খাতের উন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবনে অবদান রাখা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কার প্রদান করেন। অনুষ্ঠানে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, পাট খাতের উদ্যোক্তা, গবেষক, কৃষক প্রতিনিধি ও ব্যবসায়ী নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাস আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের ইতিহাস। এই দেশের মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও আত্মত্যাগের মাধ্যমেই গণতন্ত্রের পথ সুদৃঢ় হয়েছে। তিনি বলেন, বহু শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে অর্থবহ করতে হলে দেশকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত করতে হবে। জ্ঞান-বিজ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনে এগিয়ে না গেলে বিশ্ব প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পাটশিল্পের ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। একসময় পাটকে ‘সোনালি আঁশ’ বলা হতো, কারণ এই খাত দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস ছিল। সময়ের পরিবর্তনে নানা চ্যালেঞ্জ এলেও পাট এখনও বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার ক্ষেত্র হিসেবে রয়ে গেছে। পরিবেশবান্ধব পণ্য হিসেবে বিশ্ববাজারে পাটের চাহিদা বাড়ছে এবং এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রাষ্ট্রপতি কৃষকদের প্রতি পাট চাষে আরও আগ্রহী হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, পাটের বহুমুখী ব্যবহার বিশ্ববাজারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। পাট থেকে তৈরি ব্যাগ, কাপড়, গৃহস্থালি পণ্য, জিওটেক্সটাইলসহ নানা ধরনের আধুনিক পণ্য এখন আন্তর্জাতিক বাজারে সমাদৃত। যদি দেশের উদ্যোক্তারা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানসম্মত পণ্য তৈরি করতে পারেন, তাহলে পাট আবারও দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি তরুণ উদ্যোক্তাদের বিশেষভাবে উৎসাহিত করেন। তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মের সৃজনশীলতা এবং প্রযুক্তি-নির্ভর উদ্ভাবনই দেশের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, স্টার্টআপ উদ্যোগ এবং উদ্ভাবনী চিন্তার মাধ্যমে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডকে বিশ্ববাজারে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশের পাটজাত পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, অল্পমূল্যে পাটের ব্যাগ তৈরি ও বিপণন করা গেলে তা দেশের পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে পাটের বিকল্প নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন। বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে পরিবেশবান্ধব পণ্যের দিকে ঝুঁকছে এবং বাংলাদেশ চাইলে এই বাজারে নেতৃত্ব দিতে পারে।
তিনি বলেন, দেশের উন্নয়ন ও স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য কৃষি, শিল্প ও প্রযুক্তিকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। পাট খাতের উন্নয়নে গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করা, উন্নত মানের পাটবীজ উৎপাদন এবং বহুমুখী পাটজাত পণ্য তৈরির উদ্যোগ বাড়াতে হবে। সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদেরও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, জাতীয় পাট দিবস উপলক্ষে প্রতিবছরের মতো এবারও পাট খাতের উন্নয়ন ও অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। পাটক্ষেত উন্নয়নে গবেষণা, পাটবীজ উৎপাদনে স্বয়ম্ভরতা অর্জন, বহুমুখী পাটজাত পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং রপ্তানি সম্প্রসারণে বিশেষ অবদান রাখার জন্য এ বছর ১২ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে পাট খাতকে আরও উৎসাহিত করা এবং দেশের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়তা করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সাল থেকে প্রতিবছর ৬ মার্চ জাতীয়ভাবে পাট দিবস পালিত হয়ে আসছে। পাটের ঐতিহ্য, সম্ভাবনা ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরতে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপন করা হয়। এবারের পাট দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘পাটশিল্প গড়ে তুলুন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করুন’। এই প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে পাট খাতকে আরও শক্তিশালী করে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখার লক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিবেশবান্ধব পণ্য হিসেবে বিশ্ববাজারে পাটের চাহিদা বাড়ার ফলে বাংলাদেশের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যবহার বাড়াতে পারলে এটি দেশের জন্য বড় অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে। এজন্য আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কার্যকর বিপণন কৌশল গ্রহণ জরুরি।
অনুষ্ঠানের সমাপ্তিতে রাষ্ট্রপতি আশা প্রকাশ করেন, দেশের কৃষক, উদ্যোক্তা, গবেষক ও তরুণ প্রজন্ম একসঙ্গে কাজ করলে পাটশিল্প আবারও দেশের অর্থনীতির শক্তিশালী খাতে পরিণত হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষের আত্মত্যাগ ও পরিশ্রমের ইতিহাস আমাদের এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেয়। সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি।