সৌদির তেলক্ষেত্র ও বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নস্যাৎ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬
  • ২ বার
সৌদির তেলক্ষেত্র ও বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নস্যাৎ

প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার আবহে সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেলক্ষেত্র এবং সামরিক বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে চালানো ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করার দাবি করেছে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। শনিবার (৭ মার্চ) সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় জানান, দক্ষিণাঞ্চলের মরুভূমি অঞ্চলে শনাক্ত হওয়া ছয়টি ড্রোন এবং একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে ধ্বংস করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ড্রোনগুলো শনাক্ত করা হয় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বালুময় অঞ্চল হিসেবে পরিচিত ‘এম্পটি কোয়ার্টার’ মরুভূমিতে। আরব উপদ্বীপের বিস্তীর্ণ এই মরুভূমি অঞ্চলটি সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত এবং এর ভেতরেই অবস্থিত শায়বাহ তেলক্ষেত্র, যা দেশটির জ্বালানি অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, হামলার মূল লক্ষ্য ছিল এই শায়বাহ তেলক্ষেত্র।

সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি আরামকোর তথ্য অনুযায়ী, শায়বাহ তেলক্ষেত্র থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদিত হয়। ফলে এই স্থাপনাটির ওপর হামলার চেষ্টা শুধু সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপরই নয়, বরং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সামরিক সূত্রের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হওয়ার পরপরই ড্রোনগুলো শনাক্ত করা হয় এবং সেগুলোকে আকাশেই ধ্বংস করা হয়। একই সঙ্গে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও প্রতিহত করা হয়, যা রাজধানী রিয়াদের কাছাকাছি অবস্থিত প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটির দিকে ছোড়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি সৌদি আরবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীও এই ঘাঁটিটি ব্যবহার করেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু সামরিক বিমান এই ঘাঁটিতে অবস্থান করেছিল বলে জানা যায়। ফলে ঘাঁটিটি হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়াকে আঞ্চলিক উত্তেজনারই প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকরা।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে। ওই দিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে বলে দাবি করা হয়। এই অভিযানের পরপরই ইরান তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় এবং একে সরাসরি আগ্রাসন হিসেবে আখ্যা দেয়। এরপর থেকে পুরো অঞ্চলজুড়ে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা বাড়তে থাকে।

বর্তমানে চলমান সংঘাত অষ্টম দিনে গড়িয়েছে। এই সময়ের মধ্যে ইরান ও তার মিত্র শক্তিগুলো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে শুধু ইসরাইল নয়, বরং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোও চিহ্নিত করা হয়েছে।

বাহরাইন, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইরাকে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোও এই হামলার আওতায় এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক এই উত্তেজনা শুধু আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ এবং কৌশলগত সামরিক ভারসাম্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে সৌদি আরবের তেলক্ষেত্রগুলোকে লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টা বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

২০১৯ সালে সৌদি আরবের আরেক গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা আবকাইক ও খুরাইস তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলার ঘটনার পর থেকেই দেশটি তার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করেছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে সৌদি কর্তৃপক্ষ এখন অনেক বেশি সতর্ক এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সাম্প্রতিক এই হামলা প্রতিহত করার ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি এবং তেল উৎপাদন কার্যক্রমেও কোনো বিঘ্ন ঘটেনি। তবে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশটির সামরিক বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনেও এ ঘটনার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য বিভিন্ন দেশ শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই সংঘাত আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করে, তবে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বের নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবের তেলক্ষেত্র ও সামরিক ঘাঁটির ওপর হামলার চেষ্টা প্রতিহত হওয়ার ঘটনা আপাতত বড় ধরনের ক্ষতি এড়াতে সাহায্য করলেও আঞ্চলিক উত্তেজনা যে এখনো প্রশমিত হয়নি, সেটিই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়ে এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর উদ্বেগ বিরাজ করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত