প্রকাশ: ৭ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইসলামের মৌলিক পাঁচটি ভিত্তির অন্যতম একটি হলো জাকাত। এটি কেবল অর্থনৈতিক লেনদেনের একটি বিধান নয়; বরং মানুষের সম্পদকে পবিত্র করা, সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য তৈরি করা এবং দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি মহান ইবাদত। ইসলামী শরিয়তে নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে মুসলমানদের জন্য জাকাত আদায় করা ফরজ। তবে বাস্তব জীবনে অনেক সময় মানুষ নানা জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। বিশেষ করে অনেকেই জানতে চান, যদি কোনো ব্যক্তি ঋণগ্রস্ত হন, তাহলে তার জন্য জাকাত আদায়ের বিধান কী।
ইসলামী শরিয়তের আলোকে ফুকাহায়ে কেরাম বা ইসলামী আইনবিদরা এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাদের মতে, জাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে একজন মুসলমানের সম্পদের প্রকৃত অবস্থা বিবেচনা করা হয়। যদি কারো ওপর ঋণ থাকে, তাহলে প্রথমে সেই ঋণের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি যদি ঋণগ্রস্ত হন, তবে তাকে প্রথমে তার ঋণ পরিশোধের বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। এরপর যদি তার কাছে এমন সম্পদ অবশিষ্ট থাকে যা নিসাব পরিমাণে পৌঁছে যায়, তখন সেই সম্পদের ওপর জাকাত আদায় করা তার জন্য ফরজ হবে।
ইসলামী ঐতিহ্য ও হাদিসের বর্ণনায়ও এ বিষয়ে দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়। ইসলামের তৃতীয় খলিফা হজরত উসমান ইবনে আফফান (রা.) রমজান মাসে জাকাত আদায়ের বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, রমজান হলো জাকাত আদায়ের মাস। অতএব যদি কারো ওপর ঋণ থাকে, তাহলে সে যেন প্রথমে তার ঋণ পরিশোধ করে নেয়। এরপর যদি তার কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ অবশিষ্ট থাকে, তবে সে যেন সেই সম্পদের জাকাত আদায় করে। এই বর্ণনাটি হাদিসের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ মুওয়াত্ত্বা মালেকেও উল্লেখ রয়েছে।
জাকাতের মূল দর্শন হলো সম্পদের পবিত্রতা এবং সামাজিক ভারসাম্য নিশ্চিত করা। একজন মুসলমান যখন তার সম্পদের নির্দিষ্ট অংশ আল্লাহর পথে ব্যয় করেন, তখন তা কেবল দরিদ্র মানুষের উপকারই করে না, বরং দাতার আত্মাকেও পরিশুদ্ধ করে। পবিত্র কোরআনেও জাকাতের গুরুত্ব বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। কোরআনে নামাজের নির্দেশ যেমন বহুবার এসেছে, তেমনি জাকাত আদায়ের নির্দেশনাও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বহুবার এসেছে। ইসলামী গবেষকদের মতে, কোরআনে ‘জাকাত’ শব্দটি সরাসরি প্রায় ৩০ বার উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ‘ইনফাক’ শব্দের মাধ্যমে ৪৩ বার এবং ‘সদকা’ শব্দের মাধ্যমে ৯ বার মানুষের সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে।
এই পুনরাবৃত্ত নির্দেশনা থেকে বোঝা যায়, ইসলামে জাকাত কতটা গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। এটি কেবল ব্যক্তিগত ধর্মীয় দায়িত্ব নয়; বরং একটি সামাজিক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়।
তবে জাকাতের ক্ষেত্রে ‘নিসাব’ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নিসাব বলতে বোঝায় এমন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ, যার মালিক হলে একজন মুসলমানের ওপর জাকাত ফরজ হয়। ইসলামী শরিয়তে সাধারণভাবে সোনা, রুপা, নগদ অর্থ, ব্যবসায়িক পণ্য এবং কিছু অন্যান্য সম্পদের ওপর জাকাত নির্ধারিত রয়েছে। যখন কোনো ব্যক্তি এক পূর্ণ হিজরি বছর ধরে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক থাকেন, তখন সেই সম্পদের ওপর নির্ধারিত হারে জাকাত দিতে হয়।
কিন্তু যদি কোনো ব্যক্তি ঋণগ্রস্ত হন, তাহলে তার মোট সম্পদ থেকে ঋণের পরিমাণ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট সম্পদের হিসাব করা হয়। যদি সেই অবশিষ্ট সম্পদ নিসাবের নিচে নেমে যায়, তাহলে তার ওপর জাকাত ফরজ হয় না। আর যদি ঋণ বাদ দেওয়ার পরও সম্পদ নিসাব পরিমাণ থাকে, তাহলে সেই সম্পদের ওপর জাকাত দিতে হবে।
তবে ইসলামী আইনবিদরা আরেকটি বিষয়ও স্পষ্ট করেছেন। যদি কোনো ব্যক্তি ঋণ থাকা সত্ত্বেও তা পরিশোধ না করে নিজের কাছে সম্পদ জমিয়ে রাখেন এবং সেই সম্পদ নিসাব পরিমাণ হয়, তাহলে তার ওপর জাকাত আদায় করা ফরজ হবে। কারণ এখানে মূল বিবেচ্য বিষয় হলো তার বাস্তবিক সম্পদের পরিমাণ।
ইসলামী অর্থনীতির দৃষ্টিতে এই বিধান অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। কারণ ইসলাম মানুষকে কখনো এমন কোনো দায়িত্ব দেয় না যা তার সামর্থ্যের বাইরে চলে যায়। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে আগে তার দায়মুক্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে যদি তার কাছে পর্যাপ্ত সম্পদ থাকে, তবে সমাজের দরিদ্র মানুষের অধিকার নিশ্চিত করাও তার দায়িত্ব।
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, জাকাত ব্যবস্থার মধ্যে একটি শক্তিশালী সামাজিক কল্যাণমূলক কাঠামো নিহিত রয়েছে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে জাকাত ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাজে দারিদ্র্য অনেকাংশে কমে গিয়েছিল। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, কিছু সময় এমন পরিস্থিতিও সৃষ্টি হয়েছিল যখন জাকাত গ্রহণ করার মতো দরিদ্র মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল।
বর্তমান বিশ্বেও জাকাতকে অনেকেই একটি কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে যদি জাকাত সঠিকভাবে আদায় ও বণ্টন করা যায়, তাহলে তা দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে রমজান মাস এলেই জাকাত নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়তে দেখা যায়। অনেকেই এ সময় তাদের সম্পদের হিসাব করেন এবং দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মাঝে জাকাত বিতরণ করেন। তবে সঠিক নিয়ম ও শরিয়তের বিধান জানা না থাকায় অনেক সময় মানুষ দ্বিধায় পড়েন। বিশেষ করে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জাকাত আদায়ের বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা যায়।
ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ক্ষেত্রে একজন মুসলমানের উচিত তার সম্পদের সঠিক হিসাব করা এবং প্রয়োজন হলে কোনো আলেম বা ইসলামী আইনবিদের পরামর্শ নেওয়া। এতে করে তিনি নিশ্চিত হতে পারবেন যে তার জাকাত আদায় শরিয়তের বিধান অনুযায়ী হচ্ছে।
সবশেষে বলা যায়, জাকাত শুধু একটি আর্থিক ইবাদত নয়; এটি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দর্শনও। এর মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে দয়া, সহমর্মিতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। আর ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা দেখায় যে এই ধর্ম মানবিক বাস্তবতাকে বিবেচনায় রেখেই তার বিধান নির্ধারণ করেছে।