ইরানকে রাশিয়ার গোয়েন্দা সহায়তা নিয়ে মুখ খুলল যুক্তরাষ্ট্র

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬
  • ৩ বার
ইরানকে রাশিয়ার গোয়েন্দা সহায়তা নিয়ে মুখ খুলল যুক্তরাষ্ট্র

প্রকাশ: ৭ মার্চ  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনায় এসেছে রাশিয়া, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক সম্পর্ক। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক জাহাজ, যুদ্ধবিমান ও রাডার সিস্টেমের অবস্থান সম্পর্কে ইরানকে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে রাশিয়া। এই অভিযোগ সামনে আসার পর বিষয়টি নিয়ে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী Pete Hegseth।

তিনি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের প্রতিটি গতিবিধি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সম্ভাব্য সব পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখেই সামরিক পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে। স্থানীয় সময় শুক্রবার (৬ মার্চ) মার্কিন টেলিভিশন নেটওয়ার্ক CBS News–এর জনপ্রিয় অনুসন্ধানধর্মী অনুষ্ঠান 60 Minutes-এ অংশ নিয়ে তিনি এসব মন্তব্য করেন।

অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হেগসেথ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ দেশের সর্বোচ্চ সামরিক কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে প্রেসিডেন্ট Donald Trump নিয়মিতভাবে এই ধরনের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং গোয়েন্দা তৎপরতার বিষয়ে তথ্য পাচ্ছেন।

হেগসেথ বলেন, “আমাদের নাগরিকরা নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। কে কার সঙ্গে কথা বলছে, কে কাকে কী তথ্য দিচ্ছে—এসব বিষয়ে আমাদের কমান্ডার-ইন-চিফ সম্পূর্ণভাবে অবগত। প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে যাই ঘটুক না কেন, তার যথাযথ জবাব দেওয়া হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর প্রধান দায়িত্ব হলো সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে প্রতিনিয়ত চাপের মধ্যে রাখা এবং তাদের পরিকল্পনা ব্যাহত করা। তার ভাষায়, “আমাদের কাজ হলো শত্রুদের বিপদে ফেলা। এখন শুধু সেই সব ইরানিদেরই চিন্তিত হওয়া উচিত, যারা বেঁচে থাকার আশা করছেন।” তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

এর আগে একই বিষয়ে CBS News–কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দাবি করেন, রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ইরানের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। তিনি বলেন, এ ধরনের গোয়েন্দা তথ্যের মধ্যে রয়েছে মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজের অবস্থান, যুদ্ধবিমান মোতায়েনের তথ্য এবং আঞ্চলিক রাডার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অবস্থান সম্পর্কিত তথ্য।

এই অভিযোগের পর বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে মার্কিন প্রভাবশালী পত্রিকা The Washington Post তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক অবকাঠামোর অবস্থান সম্পর্কে রাশিয়া ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব তথ্য ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর হামলার পরিকল্পনা করতে সহায়তা করছে। যদিও রাশিয়া সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে না, তবু এই ধরনের সহায়তার মাধ্যমে দেশটি পরোক্ষভাবে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি মস্কো। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলও বিষয়টি নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। কারণ রাশিয়া যদি সত্যিই এমন গোয়েন্দা সহায়তা দিয়ে থাকে, তাহলে তা বৈশ্বিক রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।

এরই মধ্যে রাশিয়ার সরকারিভাবে পরিচালিত প্রশাসনিক কেন্দ্র Kremlin জানিয়েছে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট Vladimir Putin সম্প্রতি ইরানের প্রেসিডেন্ট Masoud Pezeshkian–এর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন।

ক্রেমলিনের বিবৃতিতে বলা হয়, ফোনালাপে পুতিন ইরানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা Ali Khamenei নিহত হওয়ার ঘটনায় গভীর সমবেদনা জানান। একই সঙ্গে তিনি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দ্রুত যুদ্ধ বন্ধ করার আহ্বান জানান।

এই ফোনালাপ এবং সাম্প্রতিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের অভিযোগ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে রাশিয়ার সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্য বরাবরই বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। জ্বালানি সম্পদ, কৌশলগত অবস্থান এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে এই অঞ্চলকে ঘিরে বিশ্ব শক্তিগুলোর আগ্রহ অত্যন্ত বেশি। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে এখানে শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। অপরদিকে ইরানও নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে।

এই পরিস্থিতিতে রাশিয়া যদি সত্যিই ইরানকে সামরিক বা গোয়েন্দা সহায়তা দিয়ে থাকে, তাহলে তা আঞ্চলিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ এতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কেবল আঞ্চলিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না থেকে বৈশ্বিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নিতে পারে।

আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে অনেকেই মনে করছেন, এই মুহূর্তে উত্তেজনা প্রশমনের জন্য রাজনৈতিক সংলাপ এবং কূটনৈতিক উদ্যোগ বাড়ানো জরুরি। অন্যথায় পরিস্থিতি দ্রুত আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, ওয়াশিংটন পরিস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং সম্ভাব্য সব হুমকি মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং নিজের সামরিক স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ তাই শুধু আঞ্চলিক রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা ধীরে ধীরে বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতার নতুন অধ্যায় হয়ে উঠছে। রাশিয়া, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই জটিল সম্পর্ক ভবিষ্যতে কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বিশ্ব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত