তেল সীমায় বিপাকে রাইড শেয়ার চালকরা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬
  • ৪ বার
তেল সীমায় বিপাকে রাইড শেয়ার চালকরা

প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা এবং জ্বালানি বাজারে সম্ভাব্য সংকটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে ওঠার পর দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সতর্ক পদক্ষেপ হিসেবে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি জ্বালানি বিক্রি না করার নির্দেশ দিয়েছে Bangladesh Petroleum Corporation। এই সিদ্ধান্তের ফলে ব্যক্তিগত যানবাহনের পাশাপাশি ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল ও গাড়িচালকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে রাইড শেয়ারিং সেবায় যুক্ত হাজারো মোটরসাইকেল চালক নতুন এই সীমাবদ্ধতার কারণে আয়-রোজগার নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।

জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, একটি মোটরসাইকেল দিনে সর্বোচ্চ দুই লিটার পেট্রল বা অকটেন সংগ্রহ করতে পারবে। ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে দৈনিক জ্বালানি সংগ্রহের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে দশ লিটার। এছাড়া স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকেল বা এসইউভি এবং মাইক্রোবাসের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে দিনে ২০ থেকে ২৫ লিটার জ্বালানি। অন্যদিকে পিকআপ ভ্যান বা লোকাল বাসের জন্য ডিজেলের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০ থেকে ৮০ লিটার। দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান এবং কনটেইনার ট্রাকের ক্ষেত্রে এই সীমা হবে দৈনিক ২০০ থেকে ২২০ লিটার।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জ্বালানি সংগ্রহের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে চালকদের রসিদ সংগ্রহ করতে হবে এবং পরবর্তীবার তেল নেওয়ার সময় সেই রসিদ দেখাতে হবে। এর মাধ্যমে অতিরিক্ত জ্বালানি মজুত বা অপব্যবহার রোধ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে এই নির্দেশনা ঘোষণার পর থেকেই সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ দেখা দিয়েছে রাইড শেয়ারিং সেবায় যুক্ত মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে। কারণ শহরাঞ্চলে দৈনিক দীর্ঘ সময় মোটরসাইকেল চালিয়ে যাত্রী পরিবহন করাই তাদের প্রধান আয়ের উৎস। নতুন নিয়ম অনুযায়ী দিনে মাত্র দুই লিটার তেল পাওয়া গেলে অনেকেরই কাজ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

রাজধানীতে ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালানো এক তরুণ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তার মোটরসাইকেল দুই লিটার তেলে প্রায় ৭০ কিলোমিটার পথ যেতে পারে। অথচ প্রতিদিন তিনি গড়ে ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত মোটরসাইকেল চালান। এতে সারাদিনে যে আয় হয়, তা দিয়েই তার পরিবারের খরচ চলে। কিন্তু যদি দিনে মাত্র দুই লিটার তেল পাওয়া যায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবে কাজ করা সম্ভব হবে না।

তিনি বলেন, এই আয় দিয়েই তার সংসার চলে এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের দেখাশোনা করতে হয়। তেলের সীমাবদ্ধতা থাকলে কাজের সময় কমে যাবে এবং আয়ের পরিমাণও কমে যাবে। এতে তার মতো অনেক চালকের পরিবার অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে পারে।

রাইড শেয়ারিং খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণ ব্যক্তিগত ব্যবহারের ক্ষেত্রে দুই লিটার তেল যথেষ্ট হতে পারে। কিন্তু যারা পেশাগতভাবে মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাদের জন্য এই পরিমাণ জ্বালানি অত্যন্ত কম। ফলে এই সিদ্ধান্তের কারণে নগর পরিবহন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এদিকে সরকার বলছে, জ্বালানি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। দেশের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় মজুতও রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা বিবেচনায় রেখে কিছু সতর্ক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

এই বিষয়ে রাজধানীর পরীবাগে একটি ফিলিং স্টেশন পরিদর্শনের সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী Anindya Islam Amit। তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে জনগণকে আশ্বস্ত করা হচ্ছে যে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আমি সরকারের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমের মাধ্যমে জনগণকে আশ্বস্ত করতে চাই—জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তার মতো কোনো কারণ নেই। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, দেশে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, বিশ্ববাজারে যে ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, তা বিবেচনায় রেখেই এই ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো সম্ভাব্য সংকটের সময়েও যেন সবার জন্য ন্যূনতম জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।

জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার মূল কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের জ্বালানি চাহিদা অনেকটাই আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা সরাসরি প্রভাব ফেলে। তাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগাম পরিকল্পনা গ্রহণ করা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

তবে একই সঙ্গে তারা মনে করেন, রাইড শেয়ারিং এবং পেশাদার পরিবহন চালকদের বিষয়টিও বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। কারণ নগর পরিবহন ব্যবস্থায় এই খাতের অবদান এখন অনেক বড়। প্রতিদিন লাখো মানুষ রাইড শেয়ারিং সেবার ওপর নির্ভর করে যাতায়াত করছেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার একদিকে যেমন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতেও সতর্ক রয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে যারা সরাসরি এই জ্বালানি ব্যবহার করে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাদের জন্য বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন রকম চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

এখন অনেক মোটরসাইকেল চালকই অপেক্ষা করছেন পরিস্থিতি কেমন হয় এবং ভবিষ্যতে এই নির্দেশনায় কোনো পরিবর্তন আসে কি না। কারণ তাদের জীবিকা অনেকটাই নির্ভর করছে প্রতিদিন কতটা তেল পাওয়া যাবে এবং কতটা সময় তারা রাস্তায় কাজ করতে পারবেন তার ওপর।

বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু জ্বালানি ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়, বরং এটি দেশের একটি বড় কর্মসংস্থান খাতের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত