প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানী ঢাকায় এক রাতেই দুটি পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন চারজন। তাদের মধ্যে রয়েছেন এক বাবা ও তার একমাত্র মেয়ে। ঈদের কেনাকাটা শেষে বাড়ি ফেরার পথে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনা দুটি শুধু চারটি প্রাণই কেড়ে নেয়নি, বরং দুটি পরিবারকে চরম শোকের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলো আবারও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার রাতে রাজধানীর সায়েন্সল্যাব মোড়ে ঘটে একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা। ওই দুর্ঘটনায় নিহত হন গণপূর্ত অধিদপ্তরের অফিস সহায়ক সাজু আহমেদ সুমন এবং তার ২৩ বছর বয়সী একমাত্র মেয়ে সিথি। পরিবার সূত্রে জানা যায়, ঈদুল ফিতর সামনে রেখে মেয়েকে নিয়ে কেনাকাটা করতে বের হয়েছিলেন সুমন। দিনভর কেনাকাটা শেষে রাতের দিকে তারা মোটরসাইকেলে করে বাসায় ফিরছিলেন। কিন্তু বাড়ি ফেরা আর হলো না তাদের।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাত প্রায় ৯টার দিকে তারা সায়েন্সল্যাব মোড়ে পৌঁছালে একটি বালুবাহী ট্রাক দ্রুতগতিতে এসে তাদের মোটরসাইকেলে সজোরে ধাক্কা দেয়। সংঘর্ষের তীব্রতায় সুমন ঘটনাস্থলেই মারা যান। গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা তার মেয়ে সিথিকে উদ্ধার করে দ্রুত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পরিবারের স্বজনরা জানান, সিথি ছিল পরিবারের একমাত্র সন্তান। তাকে ঘিরেই ছিল বাবা-মায়ের সব স্বপ্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে ভবিষ্যতে বড় কিছু করার পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু একটি বেপরোয়া ট্রাক সেই স্বপ্নগুলো মুহূর্তেই ধ্বংস করে দিয়েছে। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর এলাকাজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। সহকর্মী ও প্রতিবেশীরা জানান, সুমন ছিলেন অত্যন্ত শান্ত ও দায়িত্বশীল একজন মানুষ। মেয়েকে নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন ছিল।
এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই একই রাতে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় আরেকটি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান আরও দুজন। পুলিশ জানায়, সাত রাস্তার মোড়ে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা দুর্ঘটনার শিকার হলে নিহত হন যাত্রী হারুনুর রশিদ সানি এবং অটোরিকশাচালক আলিম। আহত হয়েছেন আরও দুজন নারী।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঈদের কেনাকাটা শেষে পরিবার নিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় বাসায় ফিরছিলেন হারুনুর রশিদ সানি। সাত রাস্তার মোড়ে পৌঁছানোর পর অটোরিকশাটি ইউটার্ন নিতে গেলে হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আইল্যান্ডে সজোরে ধাক্কা দেয়। সংঘর্ষের তীব্রতায় অটোরিকশাটি উল্টে যায় এবং এতে গুরুতর আহত হন ভেতরে থাকা সবাই।
স্থানীয় লোকজন দ্রুত আহতদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা হারুনুর রশিদ সানি ও অটোরিকশাচালক আলিমকে মৃত ঘোষণা করেন। অন্যদিকে সানির স্ত্রী এবং তার বোন গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক জানিয়েছেন, দুটি দুর্ঘটনায় নিহত চারজনের মরদেহ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। দুর্ঘটনার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট থানা-পুলিশকে জানানো হয়েছে এবং তারা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।
এদিকে রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনার এমন ঘটনা নতুন নয়। প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন মানুষ। বিশেষ করে উৎসবের সময় এই দুর্ঘটনার হার অনেক সময় বেড়ে যায় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ঈদের আগে বাজারে মানুষের ভিড়, যানবাহনের চাপ এবং অনেক ক্ষেত্রে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও সড়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকার সড়কগুলোতে এখনো কার্যকরভাবে ট্রাফিক আইন প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি। অনেক চালক নিয়ম না মেনে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালান, আবার অনেক ক্ষেত্রে গাড়ির ফিটনেস বা চালকের দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন থাকে। এসব কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, দুর্ঘটনা কমাতে হলে শুধু আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, তার সঠিক বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে চালকদের প্রশিক্ষণ, যানবাহনের নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা এবং সড়কে নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
শুক্রবার রাতের এই দুটি দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি। একদিকে ঈদের আনন্দের প্রস্তুতি, অন্যদিকে সেই আনন্দের মাঝেই চারটি পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক। বাবা ও মেয়ের একসঙ্গে মৃত্যুর খবর অনেককে নাড়া দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন অনেকেই।
স্বজনদের দাবি, শুধু দুর্ঘটনার পর মামলা করলেই হবে না, বরং দুর্ঘটনার কারণগুলো খতিয়ে দেখে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে রাজধানীর ব্যস্ত মোড়গুলোতে আরও কার্যকর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, দুটি দুর্ঘটনার ঘটনাই তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ট্রাকটির চালককে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
উৎসবের আগে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, সড়কে এক মুহূর্তের অসতর্কতাও কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে চালক, পথচারী এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।