তেহরানের মেহেরবাদে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, জ্বলছে উড়োজাহাজ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬
  • ২ বার
তেহরানের মেহেরবাদে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, জ্বলছে উড়োজাহাজ

প্রকাশ: ৭ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে ইসরাইল ও ইরানের চলমান সংঘাতে। সেই উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের রাজধানী তেহরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক বিমানবন্দর মেহেরবাদে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণকৃত ভিডিও ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, হামলার পর বিমানবন্দরের একটি অংশে আগুন ধরে যায় এবং অন্তত একটি উড়োজাহাজকে জ্বলতে দেখা যায়। আকাশে ঘন ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছড়িয়ে পড়ার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা মুহূর্তেই বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, শুক্রবার রাতে তেহরানের ব্যস্ততম এই বিমানবন্দরের কিছু অংশ লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। হামলার পরপরই বিমানবন্দরের আশপাশের এলাকায় তীব্র বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই আকাশে ধোঁয়ার বিশাল স্তম্ভ দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে আশপাশের অনেক ভবনের জানালাও কেঁপে ওঠে।

মেহেরবাদ বিমানবন্দর ইরানের রাজধানী তেহরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমান চলাচল কেন্দ্র। যদিও আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের বড় অংশ এখন ইমাম খোমেনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পরিচালিত হয়, তবুও মেহেরবাদ বিমানবন্দর এখনও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট এবং সামরিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই বিমানবন্দরে হামলার ঘটনা শুধু একটি অবকাঠামোগত ক্ষতিই নয়, বরং তা প্রতীকীভাবেও বড় একটি বার্তা বহন করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, বিমানবন্দরের একটি এলাকায় আগুন জ্বলছে এবং একটি উড়োজাহাজে আগুন ধরে গেছে। আগুনের তাপ ও ধোঁয়া দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। কিছু ভিডিওতে দেখা যায়, বিমানবন্দরের রানওয়ে সংলগ্ন এলাকায় আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ছে এবং উদ্ধারকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।

স্থানীয় সময় শুক্রবারের আগে প্রকাশিত স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, মেহেরবাদ বিমানবন্দরের রানওয়ে ও পার্কিং এলাকায় একাধিক বিমান অবস্থান করছিল। তবে নতুন করে চালানো হামলায় ঠিক কতটি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিংবা বিমানবন্দরের কোন কোন অংশে আঘাত লেগেছে, তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

এই হামলার ঘটনা ঘটেছে এমন এক সময় যখন ইসরাইলি সামরিক বাহিনী ইরানে ‘নতুন দফায় ব্যাপক বিমান হামলা’ শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে। কয়েক দিন ধরেই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছিল এবং বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছিল। সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই তেহরানের মেহেরবাদ বিমানবন্দর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এর আগেও গত ৪ মার্চ একই বিমানবন্দরে হামলা চালানোর দাবি করেছিল ইসরাইল। সে সময় ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছিল, বিমানবন্দরের ভেতরে থাকা এমন কিছু প্রতিরক্ষা ও শনাক্তকরণ ব্যবস্থা ধ্বংস করার জন্য হামলা চালানো হয়েছে, যেগুলো তাদের যুদ্ধবিমানগুলোর জন্য হুমকি তৈরি করছিল। সেই হামলায় বিমানবন্দরের হেলিকপ্টার নির্মাণ বা রক্ষণাবেক্ষণের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে দাবি করা হয়।

তবে শুক্রবার রাতের হামলা আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিস্ফোরণের শব্দ কয়েক কিলোমিটার দূর থেকেও শোনা গেছে এবং আকাশে ধোঁয়ার স্তম্ভ অনেকক্ষণ ধরে দেখা গেছে।

এদিকে এই হামলার পরপরই ইরানের পক্ষ থেকেও পাল্টা সামরিক তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ইসরাইলের বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করেছে। শনিবার সকালে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয়ভাবে কাজ করছে এবং সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকি প্রতিহত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

ইসরাইলের বিভিন্ন অঞ্চলের বাসিন্দাদের মোবাইল ফোনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনী। সতর্কবার্তা পাওয়ার পর অনেক মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। কয়েকটি শহরে সাইরেন বাজতে শোনা গেছে বলেও স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের বিস্তার নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষের মাত্রা বাড়তে থাকলে তা গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো যেমন বিমানবন্দর, জ্বালানি স্থাপনা বা সামরিক ঘাঁটিতে হামলা হলে তার প্রভাব আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিমান চলাচলেও পড়তে পারে।

মেহেরবাদ বিমানবন্দরে হামলার পর সেখানে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। জরুরি সেবা ও উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালিয়েছে। বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়েছে কিনা, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তারা হামলার ঘটনা তদন্ত করে দেখছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং সম্ভাব্য হতাহতের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, চলমান এই সংঘাত এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে প্রতিটি হামলা নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়ে দিচ্ছে। উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি আঘাত পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। তেহরানের গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরে হামলার ঘটনা সেই উত্তেজনারই আরেকটি নাটকীয় অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থির পরিস্থিতির দিকে গভীর নজর রাখছে বিশ্ব সম্প্রদায়। কারণ ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তা শুধু ওই অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বৈশ্বিক রাজনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল থেকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হচ্ছে। তবে মেহেরবাদ বিমানবন্দরের এই হামলা প্রমাণ করছে যে সংঘাতের উত্তাপ এখনো কমেনি, বরং প্রতিদিনই নতুন নতুন উত্তেজনার জন্ম দিচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত