প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে অন্তর্বর্তী সরকারের আট উপদেষ্টার বিরুদ্ধে তোলা দুর্নীতির অভিযোগ। কয়েক মাস আগে এই অভিযোগ তুলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার। সে সময় তিনি সরাসরি কোনো নাম প্রকাশ না করলেও দাবি করেছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তত আটজন উপদেষ্টা এবং দুইজন সচিবের বিরুদ্ধে সীমাহীন দুর্নীতির তথ্যপ্রমাণ তার কাছে রয়েছে। সেই বক্তব্যের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও অভিযোগগুলোর কোনো দৃশ্যমান তদন্ত বা আইনি পদক্ষেপ না হওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠছে—আসলে কী ঘটেছিল এবং ওই আট উপদেষ্টার ভবিষ্যৎ কী?
বর্তমানে প্রশাসনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা এ বি এম আবদুস সাত্তার গত বছর যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা তখনকার রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ওই বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তিনি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পান। ফলে তার আগের বক্তব্য এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে এবং অনেকেই মনে করছেন, তার হাতে যদি সত্যিই দুর্নীতির প্রমাণ থেকে থাকে তবে তা প্রকাশ করা উচিত।
গত বছরের ৮ আগস্ট রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে আয়োজিত ‘জুলাই গণ অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ও আগামী দিনের জনপ্রশাসন’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আবদুস সাত্তার প্রথমবারের মতো ওই বিস্ফোরক অভিযোগ সামনে আনেন। তিনি বলেন, প্রমাণ ছাড়া তিনি কখনো কোনো কথা বলেন না এবং অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তত আটজন উপদেষ্টার সীমাহীন দুর্নীতির বিষয়ে তার কাছে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ রয়েছে। সেই বক্তব্যে তিনি সরাসরি নাম উল্লেখ না করলেও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টাদের দক্ষতা ও কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
তার বক্তব্যে বিশেষভাবে উঠে আসে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের বিষয়টি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা ছাড়া কাউকে দায়িত্ব দেওয়া কতটা যৌক্তিক। একইভাবে স্থানীয় সরকার এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব একজন অনভিজ্ঞ উপদেষ্টার হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন।
শুধু প্রশাসনিক দক্ষতা নিয়েই নয়, দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কেও তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। তার বক্তব্যে উঠে আসে এমন কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য, যা সেই সময় জনমনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। তিনি দাবি করেন, কোনো এক উপদেষ্টার পিয়নের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা পাওয়া গেছে এবং আরেক উপদেষ্টার ব্যক্তিগত সহকারীর অ্যাকাউন্টে প্রায় ২০০ কোটি টাকা জমা রয়েছে। এই ধরনের তথ্য সামনে এনে তিনি প্রশ্ন তোলেন, এত বড় অঙ্কের অর্থের উৎস কী এবং কেন এ বিষয়ে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
আবদুস সাত্তার তখন আরও বলেন, গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক নিয়োগ ও বদলির ক্ষেত্রে অনেক সময় সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টাদের সঙ্গে সমঝোতা ছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় না। এই বক্তব্য প্রশাসনের ভেতরে এবং বাইরে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দেয়। তিনি দুর্নীতির বিষয়ে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ভবিষ্যতে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের জুলাই সনদে স্বাক্ষর করে দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। ফলে কেউ যদি দুর্নীতিতে জড়ায় তবে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে এবং এতে ব্যক্তি ও পরিবারের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
তার সেই বক্তব্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল, অনেকের মতে অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরের দুর্নীতির পরিমাণ আগের ১৫ বছরের দুর্নীতিকেও ছাড়িয়ে গেছে। এমন মন্তব্য সেই সময় রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবল বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল।
এই ঘটনার পর দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, কেউ যদি এত গুরুতর অভিযোগ করেন তবে তার দায়িত্ব হলো সংশ্লিষ্ট প্রমাণ যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া। অন্যথায় এ ধরনের অভিযোগ জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। তিনি আরও বলেন, জনগণের জানার অধিকার রয়েছে এবং যদি সত্যিই দুর্নীতির ঘটনা ঘটে থাকে তবে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত তা তদন্ত করা।
তবে অভিযোগ ওঠার পরপরই সরকারের পক্ষ থেকে তা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করা হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আবদুর রশীদের স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, অজ্ঞাতনামা উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে করা অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং এ ধরনের অভিযোগের কোনো প্রমাণ থাকলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বিবৃতিতে জানান, আবদুস সাত্তারের বক্তব্য তার ব্যক্তিগত মতামত এবং এর সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই।
এরপর দীর্ঘ সময় ধরে বিষয়টি নিয়ে তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। অভিযোগে যাদের কথা বলা হয়েছিল তাদের নামও প্রকাশ হয়নি এবং কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের খবরও সামনে আসেনি। কিন্তু সম্প্রতি আবদুস সাত্তার সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়টি আবারও আলোচনায় ফিরে এসেছে।
প্রশাসনিক মহল ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যখন প্রকাশ্যে এমন গুরুতর অভিযোগ করেন তখন তা স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন তৈরি করে। এখন যেহেতু তিনি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন, তাই অনেকেই মনে করছেন তার উচিত অভিযোগগুলোর সত্যতা পরিষ্কার করা। যদি সত্যিই দুর্নীতির প্রমাণ থাকে তবে তা প্রকাশ করে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা প্রয়োজন। আর যদি অভিযোগ প্রমাণিত না হয়, তাহলে সেই ব্যাখ্যাও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা দরকার।
এদিকে এ বিষয়ে জানতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট আট উপদেষ্টার নাম প্রকাশ করা হবে কি না বা অভিযোগের বিষয়ে কোনো তদন্ত শুরু হবে কি না—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত অভিযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি দেশের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নের সঙ্গেও জড়িত। তাই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা এবং প্রয়োজনে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।