মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত: প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিপর্যয়ে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬
  • ২ বার
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত: প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিপর্যয়ে

প্রকাশ: ৭ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে চলমান তীব্র সংঘাত শুধু আন্তর্জাতিক রাজনীতি নয়, বাংলাদেশের প্রবাসী কর্মী এবং দেশের অর্থনীতির ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। ইরানে যৌথ হামলার প্রথম ধাপের পর নিহত হয়েছেন আয়াতুল্লাহ খামেনি ও তার পরিবারের সদস্যসহ অন্তত অর্ধশতাধিক সিনিয়র কর্মকর্তা। এ হামলার পরই তেহরানের পাল্টা হামলার ফলে ইরান ও ইসরায়েলে হতাহতের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। ইতিমধ্যেই ইরানে এক হাজারের বেশি এবং ইসরায়েলে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাতেও হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় প্রায় অর্ধশত মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

বাংলাদেশের প্রায় ৪৫ লাখ প্রবাসী শ্রমিক গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলভুক্ত তেল সমৃদ্ধ ছয়টি দেশে বাস করেন। এসব প্রবাসীর অধিকাংশই দেশীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ রেমিট্যান্সের উৎস। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এই প্রবাসীরা চাকরি হারাতে পারেন বা দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হতে পারেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট প্রবাসী আয়ের ৪৫.৪০ শতাংশ এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশগুলো থেকে। এই অর্থনৈতিক রেমিট্যান্স দেশের মুদ্রার রিজার্ভ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মূল ভিত্তি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শহীদুল জাহীদ বলেন, “সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে প্রবাসীরা অর্থনৈতিক দূরাবস্থার সম্মুখীন হবেন। তাদের সন্তানদের শিক্ষা ও পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে ব্যর্থতা দেখা দিতে পারে। প্রবাসী আয়ের উপর নির্ভরশীল পরিবারের জন্য এটি বড় ধাক্কা হবে। এ অবস্থায় সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, “প্রবাসীরা চাকরি হারালে রেমিট্যান্স বন্ধ হয়ে যাবে। দেশে ফেরার প্রেক্ষিতে তাদের জন্য নতুন বাসস্থানের ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান রাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। এটি দেশের সামাজিক নিরাপত্তা খাতেও গভীর প্রভাব ফেলবে।” তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের ফলে বৈশ্বিক তেলবাজারের অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে, যা বাংলাদেশসহ প্রবাসী শ্রমিক নির্ভর দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়াবে।

সংঘাতের দীর্ঘায়ু এবং প্রভাবের মাত্রা বিবেচনা করে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন। বৈশ্বিক বাজারে নেতিবাচক প্রভাব এবং শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ার ফলে বেকারত্বের হার বাড়তে পারে। বিশেষ করে গালফ অঞ্চলের তৃতীয় শ্রেণীর শ্রমজীবী এবং নিম্ন আয়ের প্রবাসীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। সামাজিক, মানসিক এবং অর্থনৈতিক প্রভাব মিলিতভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।

করোনার সময়ের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও সামরিক দ্বন্দ্বের প্রভাব সরাসরি শ্রমবাজার এবং অর্থনীতির উপর পড়ে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত চলতে থাকলে বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্স প্রবাহ স্থিতিশীল থাকবে না, যা দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আরও দুর্বল করবে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের এবং নীতি নির্ধারক সংস্থাগুলোর জন্য প্রবাসী শ্রম বাজার ও বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিকল্পনা করা অত্যন্ত জরুরি।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট শুধু প্রবাসী শ্রমিকদের জীবনযাত্রা প্রভাবিত করছে না, বরং বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোর ওপরও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে। দেশে রেমিট্যান্স বন্ধ হয়ে গেলে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থা বিপন্ন হতে পারে। এছাড়া দেশে ফিরে আসা প্রবাসীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান ও বসবাসের ব্যাবস্থা 마련 করতে রাষ্ট্রকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হবে।

বর্তমান পরিস্থিতি অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রবাসীদের মানসিক চাপও বাড়াচ্ছে। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি এবং দেশের অভ্যন্তরে সম্ভাব্য সামাজিক অস্থিরতা মিলিতভাবে প্রবাসী ও তাদের পরিবারকে কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকারের উচিত প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য উপযুক্ত নীতি গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের দীর্ঘায়ু নির্ধারণে এখনও কোনো সুস্পষ্ট সময়সীমা নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরান দুপক্ষই এ সংকটের সমাধান নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, চলমান সংঘাতের কারণে প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের রেমিট্যান্সে প্রভাব পড়বে এবং দেশে ফিরে আসার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

এ পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতি, শ্রমবাজার এবং সামাজিক নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। তাই সরকারের পাশাপাশি বৈদেশিক প্রবাসী বিষয়ক সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া একান্ত প্রয়োজন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত