প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলার আগে হরমুজ প্রণালি ও ওমান উপসাগর পার হয়ে আসা ১৫টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে শুরু করেছে। এসব জাহাজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণার আগেই বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল। বর্তমানে বন্দরে পৌঁছানো ও পথে থাকা জাহাজগুলোর মধ্যে চারটিতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), দুটি জাহাজে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি), এবং নটকে সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল ক্লিংকার রয়েছে। মোট ১৫টি জাহাজে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টন পণ্য বোঝাই করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই ১২টি জাহাজ বন্দরে পৌঁছেছে, বাকি তিনটি এই সপ্তাহে আগমনের আশা করা হচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পরে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। তেহরান পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। হরমুজ প্রণালি ইরাক, ইরান, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্য চলাচলের অন্যতম প্রধান নৌপথ। এই প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বজুড়ে তেল ও এলএনজি সরবরাহের পাঁচ ভাগের এক ভাগ ঝুঁকির মুখে পড়বে।
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, কাতারের রাস লাফান বন্দর থেকে ‘আল জোর’ ও ‘আল জাসাসিয়া’ নামে দুটি এলএনজি বোঝাই জাহাজ ইতিমধ্যে বন্দরে পৌঁছেছে। এছাড়া এলপিজি বোঝাই ‘সেভান’ নামের জাহাজ রোববার বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এই জাহাজটিতে রয়েছে ২২ হাজার ১৭২ টন এলপিজি, যা ওমানের সোহার বন্দর থেকে এসেছে। এর আগে একই বন্দর থেকে ‘জি ওয়াইএমএম’ নামে আরেকটি এলপিজিবাহী জাহাজ ১৯ হাজার ৩১৬ টন এলপিজি নিয়ে বন্দরে পৌঁছেছিল। দুটি জাহাজে মোট ৩৫ হাজার টন এলপিজি রয়েছে, যা মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির জন্য বরাদ্দ।
সিমেন্টশিল্পের কাঁচামাল ক্লিংকার, জিপসাম, চুনাপাথর এবং পাথর বোঝাই কয়েকটি জাহাজও চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। এই জাহাজগুলিতে মোট ৫ লাখ ১৫ হাজার টন কাঁচামাল রয়েছে। কুয়েতের শুয়াইবা বন্দর থেকে ‘বে ইয়াসু’ নামের একটি জাহাজ পাঁচ হাজার টন মনোইথিলিন গ্লাইকোল (এমইজি) নিয়ে বন্দরে এসেছে।
স্থানীয় এলএনজি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ইউনি গ্লোবাল বিজনেস লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ উপমহাব্যবস্থাপক মো. নুরুল আলম প্রথম আলোকে জানান, চারটি এলএনজি জাহাজের চট্টগ্রামে পৌঁছানো প্রায় নিশ্চিত, তবে ‘লিবারেল’ নামের জাহাজটি এখনও হরমুজ প্রণালির মধ্যেই রয়েছে। পরবর্তী চালান নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে।
সরকারও যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য সরবরাহ সংকট এড়াতে খোলাবাজার থেকে দুটি এলএনজি জাহাজ ক্রয় করেছে, যা এখনো বন্দরে পৌঁছায়নি। চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে এসব দেশ থেকে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে, যার বড় অংশই জ্বালানি পণ্য। তবে যদি প্রণালির পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হয়, নতুন জাহাজ আসা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা শুধু সরবরাহ ব্যবস্থা নয়, অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করতে পারে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি ও কাঁচামাল সরবরাহে বিলম্ব শিল্প উৎপাদন এবং খুচরা বাজারের মূল্য বৃদ্ধি করতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। সরকার, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও ব্যবসায়ীরা এই সংকট মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি নেয়ার পাশাপাশি খোলা বাজারের বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতের আগে হরমুজ প্রণালি পার হওয়া জাহাজগুলো নিরাপদে বাংলাদেশে পৌঁছানোতে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এলএনজি ও এলপিজির মতো জ্বালানি পণ্য দেশের গ্যাস সরবরাহে, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্পকলায় অপরিহার্য। এ কারণে বন্দরের নিরাপত্তা এবং পরিচালনায় তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। বন্দরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিটি জাহাজ বন্দরে আসার সাথে সাথেই দ্রুত লোডিং-আনলোডিং নিশ্চিত করা হচ্ছে যাতে দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে এটি দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি ও সরবরাহ চেইনকে আরও প্রভাবিত করতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এটি ইতিমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ সংকট, কারণ হরমুজ প্রণালি পার হওয়া জাহাজগুলো দেশের জ্বালানি ও শিল্প খাতের জন্য সরাসরি প্রভাব ফেলে। তাই বন্দরে জাহাজগুলো নিরাপদে পৌঁছানো এবং পরবর্তী সরবরাহ নিশ্চিত করা দেশের অর্থনীতি এবং শিল্প উৎপাদনকে স্থিতিশীল রাখার জন্য অপরিহার্য।
উপসংহারে বলা যায়, হরমুজ প্রণালি পার হওয়া ১৫টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশের জ্বালানি ও কাঁচামাল সরবরাহে অন্তত সাময়িক স্থিতিশীলতা এসেছে। তবে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল থাকায় বন্দরের কার্যক্রম, সরকারী তৎপরতা ও ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।