যুদ্ধের শঙ্কায় দুবাই থেকে সম্পদ সরাচ্ছেন ধনী এশীয়রা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬
  • ২ বার
যুদ্ধের শঙ্কায় দুবাই থেকে সম্পদ সরাচ্ছেন ধনী এশীয়রা

প্রকাশ: ০৭ মার্চ  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা শুধু সামরিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও। দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম নিরাপদ আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই এখন সেই আস্থার জায়গা হারানোর আশঙ্কার মুখে পড়েছে। যুদ্ধের সম্ভাবনা ঘনিয়ে আসার পর থেকেই সেখানে বসবাসরত অনেক ধনী এশীয় বিনিয়োগকারী তাদের সম্পদ অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছেন।

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ইরানের প্রথম দফা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর প্রকাশিত হওয়ার পরপরই দুবাইয়ে বসবাসকারী দুই ভারতীয় উদ্যোক্তা গভীর উদ্বেগে পড়েন। তারা আশঙ্কা করেন, সংঘাত যদি দ্রুত বিস্তার লাভ করে, তাহলে উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিবেশ অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। ওই দিনই তারা স্থানীয় ব্যাংক থেকে প্রত্যেকে এক লাখ ডলারের বেশি অর্থ সিঙ্গাপুরে স্থানান্তরের চেষ্টা করেন।

তবে প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে তাদের প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। পরবর্তী সময়ে তাদের একজন অন্য একটি এমিরেটসভিত্তিক ব্যাংকের মাধ্যমে সিঙ্গাপুরের একটি ব্যাংক হিসাবে অর্থ স্থানান্তর করতে সক্ষম হন। এই ঘটনাটি কেবল দুই ব্যক্তির সিদ্ধান্ত নয়; বরং বৃহত্তর একটি প্রবণতার প্রতিফলন বলেই মনে করছেন অর্থনীতি বিশ্লেষক ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা খাতের বিশেষজ্ঞরা।

শিল্প উপদেষ্টা, সম্পদ ব্যবস্থাপক এবং আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুবাইয়ে বসবাসরত বহু ধনী এশীয় একই ধরনের পরিকল্পনা করছেন। কেউ কেউ ইতোমধ্যে তাদের সম্পদের একটি অংশ সিঙ্গাপুর বা হংকংয়ের মতো আঞ্চলিক আর্থিক কেন্দ্রে স্থানান্তর করেছেন, আবার অনেকে সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজছেন। তাদের প্রধান উদ্বেগ, যদি সংঘাত দীর্ঘায়িত হয় এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি অবনতির দিকে যায়, তাহলে বিনিয়োগ ও সম্পদ রক্ষার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।

গত এক দশকে দুবাই ধনী উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছিল। বিশেষ করে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে বহু ব্যবসায়ী সেখানে বসতি গড়েছেন। নিরাপত্তা, কর সুবিধা, উন্নত অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ—এসব কারণে দুবাই দ্রুতই বৈশ্বিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। চীনা, ভারতীয় ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু ধনী পরিবার সেখানে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে।

এর পাশাপাশি গত কয়েক বছরে উপসাগরীয় অঞ্চলের রিয়েল এস্টেট ও অন্যান্য সম্পদের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে দুবাই শুধু বসবাসের জায়গা নয়, বরং বিনিয়োগের জন্যও অন্যতম আকর্ষণীয় শহর হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের মোট সম্পদের পরিমাণ ইতোমধ্যে দেড় ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

কিন্তু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের মধ্যে সংঘাতের জেরে এই স্থিতিশীলতার চিত্রে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ইরানের পাল্টা হামলার পর উপসাগরীয় অঞ্চলের আকাশ ও সমুদ্রপথে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। দীর্ঘদিন ধরে ‘শান্তি ও বাণিজ্যের মরুদ্যান’ হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চল হঠাৎ করেই যুদ্ধের সম্ভাব্য প্রভাবের মুখোমুখি হয়ে পড়ে। বিলাসবহুল জীবনযাত্রা ও ব্যবসায়িক সম্ভাবনার যে চিত্র এতদিন বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করেছিল, এখন সেখানে অনিশ্চয়তার ছায়া দেখা দিচ্ছে।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রাইভেট ওয়েলথ আইনজীবী রায়ান লিন জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক পরিস্থিতির পর থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, দুবাইয়ে অবস্থানরত তার প্রায় ২০ জন গ্রাহকের মধ্যে অন্তত ছয় থেকে সাতজন ইতোমধ্যে সম্পদ স্থানান্তর নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাদের মধ্যে তিনজন দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনাও করছেন। এই গ্রাহকদের প্রত্যেকের গড় সম্পদের পরিমাণ প্রায় পাঁচ কোটি ডলার।

আন্তর্জাতিক কর ও আইনি পরিষেবা প্রতিষ্ঠান আন্ডারসন গ্লোবালের প্রিন্সিপাল আইরিস জু জানিয়েছেন, এই সপ্তাহেই প্রায় ১০ থেকে ২০টি ধনী পরিবারের অফিস তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তারা মধ্যপ্রাচ্য থেকে তাদের সম্পদ সিঙ্গাপুরে সরিয়ে নেওয়ার আইনি ও আর্থিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। তার মতে, অনেকেই মনে করছেন এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং সে কারণে তারা আগেভাগেই বিকল্প ব্যবস্থা নিতে চান।

সিঙ্গাপুরের এক সম্পদ উপদেষ্টাও জানিয়েছেন, তিনি ইতোমধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ১৩ জন ক্লায়েন্টের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তাদের অর্ধেকের বেশি এখন সিঙ্গাপুরে তাদের সম্পদ স্থানান্তরের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন। তার ভাষায়, যুদ্ধ শেষ হোক বা না হোক, এই ধরনের অস্থির পরিস্থিতি বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাসে বড় ধরনের আঘাত হানে। অনেকেই মনে করছেন, বারবার ভ্রমণ বা ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

তবে সব সম্পদ ব্যবস্থাপক পরিস্থিতিকে একইভাবে দেখছেন না। কেউ কেউ মনে করছেন, সাময়িক উদ্বেগ থাকলেও বড় আকারে পুঁজি স্থানান্তর এখনো শুরু হয়নি। দুবাইভিত্তিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ডব্লিউআরআইএসই প্রাইভেট মিডল ইস্টের প্রধান নির্বাহী ধ্রুব জ্যোতি সেনগুপ্ত জানিয়েছেন, তাদের গ্রাহকদের বেশিরভাগই এখনো সংযুক্ত আরব আমিরাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার ওপর আস্থা রাখছেন। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হলেও বড় ধরনের পুঁজি সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত এখনো খুব সীমিত পর্যায়ে রয়েছে।

এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর খালেদ মোহাম্মদ বালামা পরিস্থিতি নিয়ে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, দেশটির ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত দৃঢ়, শক্তিশালী এবং স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যেও ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বীমা কোম্পানিগুলো স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ব্যাংক অব সিঙ্গাপুর এবং ডিবিএস গ্রুপও জানিয়েছে, তাদের গ্রাহকেরা এখনো বড় ধরনের সিদ্ধান্ত না নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। অনেকেই অপেক্ষা করছেন সংঘাতের গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্য। কারণ যুদ্ধ যদি দ্রুত থেমে যায়, তাহলে হয়তো বড় ধরনের পুঁজি স্থানান্তরের প্রয়োজন হবে না।

তবু বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাপ্রবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে। বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা এখন আর শুধু কর সুবিধা বা ব্যবসায়িক পরিবেশের দিকে তাকিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না; তারা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া আস্থার পরিবেশ যদি টালমাটাল হয়ে পড়ে, তাহলে এর প্রভাব শুধু দুবাই নয়, পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিতেই পড়তে পারে।

বিশ্ব অর্থনীতির এই অনিশ্চিত সময়ে বিনিয়োগকারীরা তাদের সম্পদ নিরাপদ রাখতে নতুন করে হিসাব-নিকাশ করছেন। আর সেই হিসাবের কেন্দ্রে এখন উঠে এসেছে একটাই প্রশ্ন—যুদ্ধ যদি সত্যিই দীর্ঘ হয়, তাহলে নিরাপদ আশ্রয় কোথায়?

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত