প্রকাশ: ৭ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা আরও শক্তিশালী ও সার্বজনীন করার লক্ষ্যে বড় ধরনের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। দেশের স্বাস্থ্যখাতে দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকট, সেবা ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এবং তদারকির ঘাটতির মধ্যে এবার নতুন পরিকল্পনার কথা জানালেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এম এ মুহিত। তিনি জানিয়েছেন, সরকার এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে, যার মধ্যে প্রায় ৮০ হাজারই হবেন নারী। এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
শনিবার (৭ মার্চ) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ সর্বজনীন স্বাস্থ্যের পথে’ শীর্ষক এক ডায়ালগ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এ তথ্য জানান। স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে আয়োজিত এই আলোচনায় নীতিনির্ধারক, গবেষক, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
ডা. এম এ মুহিত বলেন, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কার্যকর করতে সরকার নতুন কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। তিনি জানান, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রায় এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে, যাদের মধ্যে অধিকাংশই নারী। এর মাধ্যমে গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে বলে মনে করছে সরকার।
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী না করলে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এজন্য সরকারের নতুন পরিকল্পনায় কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূমিকা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে নারীদের স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে নিয়োগ দিলে মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুসেবা এবং পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, সরকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো ই-হেলথ কার্ড চালু করা। তিনি বলেন, ই-হেলথ কার্ড বাস্তবায়নের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কাঠামো গঠনের কাজ চলছে। এই কার্ড চালু হলে দেশের নাগরিকরা একটি ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিচয়ের আওতায় আসবেন, যার মাধ্যমে চিকিৎসা ইতিহাস, সেবার তথ্য এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্য সুবিধা এক প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাবে।
তার মতে, ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা চালু হলে রোগীদের চিকিৎসা প্রক্রিয়া আরও সহজ হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়বে। একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীদের সেবার মান উন্নত করা সম্ভব হবে।
তবে স্বাস্থ্যখাতে বিদ্যমান নানা সমস্যা ও দুর্নীতির বিষয়টিও খোলাখুলিভাবে তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি একটি বাস্তবতা এবং এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রকল্প ও উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে এই দুর্নীতি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, অতীতে অনেক পরিকল্পনা থাকলেও সেগুলোর অনেক কিছুই বাস্তবায়নের পথে দুর্নীতির কারণে থমকে গেছে।
ডা. এম এ মুহিত বলেন, যদি সঠিক তদারকি না থাকে তাহলে বড় বড় প্রকল্পও শেষ পর্যন্ত দুর্নীতির খাতে পরিণত হতে পারে। তাই ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যখাতের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, পুরো প্রক্রিয়ায় একটি সুসংগঠিত ‘পাইপলাইনিং’ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা যায় এবং দুর্নীতির সুযোগ কমে আসে।
তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে শুধু অবকাঠামো বা নতুন পরিকল্পনা করলেই হবে না; সেগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি। এজন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিভিন্ন পর্যায়ে তদারকি জোরদার করার উদ্যোগ নিচ্ছে।
সরকারি হাসপাতালগুলোর আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য। প্রতিমন্ত্রী বলেন, অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতালের আশপাশে সক্রিয় দালালরা রোগীদের বিভ্রান্ত করে এবং তাদের বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়। এর ফলে সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতালের সেবা নিতে গিয়ে নানা ভোগান্তিতে পড়েন।
তিনি বলেন, সরকার এই সমস্যার বিষয়েও গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। হাসপাতালগুলোতে দালাল চক্রের প্রভাব কমাতে প্রশাসনিক ব্যবস্থা জোরদার করা হবে এবং রোগীদের নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অনেক সময় সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিয়মিত উপস্থিত না থাকার অভিযোগ পাওয়া যায়, যা স্বাস্থ্যসেবার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই সমস্যা সমাধানে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং চিকিৎসকদের দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে নতুন নীতিমালা ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত স্বাস্থ্যখাতের গবেষক ও বিশেষজ্ঞরাও দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তারা বলেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে অনেক অগ্রগতি হলেও এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবা চালু করা গেলে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব। পাশাপাশি স্বাস্থ্যখাতে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হলে জনগণের আস্থা আরও বাড়বে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্বাস্থ্য সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হার কমানো, টিকাদান কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বিস্তারের ক্ষেত্রে দেশটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসা পেয়েছে। তবে দ্রুত বাড়তে থাকা জনসংখ্যা এবং নগরায়ণের কারণে স্বাস্থ্যসেবার চাহিদাও ক্রমেই বাড়ছে।
এই বাস্তবতায় সরকারের নতুন পরিকল্পনাকে অনেকেই সময়োপযোগী উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে বিপুলসংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়নের জন্য শুধু নিয়োগই যথেষ্ট নয়; প্রশিক্ষণ, তদারকি এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যদি এসব বিষয় সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে।
সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় নতুন গতি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং নতুন জনবল নিয়োগ দেশের স্বাস্থ্যখাতকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করে তুলতে সহায়ক হতে পারে।