লোহাগড়ায় আধিপত্য সংঘর্ষে ইউপি সদস্যসহ আহত ১২

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬
  • ২ বার
লোহাগড়ায় আধিপত্য সংঘর্ষে ইউপি সদস্যসহ আহত ১২

প্রকাশ: ০৭ মার্চ  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। শনিবার সকালে উপজেলার লক্ষ্মীপাশা ইউনিয়নের বাঁকা গ্রামে এই সংঘর্ষে একজন ইউপি সদস্যসহ অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন। স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে শুরু হওয়া এই সংঘর্ষ মুহূর্তেই পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। আহতদের উদ্ধার করে লোহাগড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গুরুতর আহত কয়েকজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য নড়াইল জেলা হাসপাতাল ও খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, লোহাগড়া উপজেলার লক্ষ্মীপাশা ইউনিয়নের বাঁকা গ্রামে দীর্ঘদিন ধরেই আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুটি পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। একদিকে স্থানীয় ইউপি সদস্য জিরু কাজীর অনুসারীরা এবং অন্যদিকে আক্তার হোসেনের সমর্থকদের মধ্যে নানা বিষয় নিয়ে প্রায়ই বিরোধ দেখা দিত। এলাকাবাসীর মতে, দুই পক্ষের এই দ্বন্দ্ব অনেক দিন ধরেই গ্রামবাসীর মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছিল। তবে সাম্প্রতিক একটি ছোট ঘটনার সূত্র ধরে সেই উত্তেজনা শনিবার সকালে সহিংস রূপ নেয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার দুপুরে গ্রামের একটি স্যালোমেশিনের পানির পাম্প চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ওই ঘটনার জন্য এক পক্ষ অপর পক্ষকে দায়ী করে এবং তা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। বিষয়টি প্রথমে কথাকাটাকাটির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও রাতে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়তে থাকে। অবশেষে শনিবার সকালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

সকাল প্রায় ৯টার দিকে বাঁকা গ্রামে দুই পক্ষের লোকজন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান নেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় সংঘর্ষ। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুই পক্ষের লোকজন লাঠিসোটা, দা ও অন্যান্য দেশীয় অস্ত্র নিয়ে একে অপরের ওপর হামলা চালায়। এতে কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। গ্রামবাসীদের অনেকেই আতঙ্কে ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।

এই সংঘর্ষে ইউপি সদস্য জিরু কাজীসহ অন্তত ১২ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে। স্থানীয়রা দ্রুত তাদের উদ্ধার করে লোহাগড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর গুরুতর আহত কয়েকজনকে নড়াইল জেলা হাসপাতাল ও খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আহতদের অনেকের শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাত এবং মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

সংঘর্ষের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকাজুড়ে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে দুই পক্ষকে ছত্রভঙ্গ করা সম্ভব হয়। বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে যাতে নতুন করে কোনো সংঘর্ষের ঘটনা না ঘটে।

লোহাগড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুর রহমান জানিয়েছেন, বাঁকা গ্রামের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন। তিনি বলেন, ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

তিনি আরও জানান, সংঘর্ষের পেছনে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ কাজ করেছে। সাম্প্রতিক একটি চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেই বিরোধ নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করে। ঘটনার বিষয়ে তদন্ত চলছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয়দের মতে, গ্রামাঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধ নতুন কিছু নয়। অনেক সময় ছোটখাটো ঘটনা বা ভুল বোঝাবুঝি থেকেও বড় ধরনের সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে। বাঁকা গ্রামের সাম্প্রতিক ঘটনাও তেমনই একটি উদাহরণ। গ্রামের সাধারণ মানুষ এই ধরনের সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং দ্রুত স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।

গ্রামের একাধিক বাসিন্দা জানান, দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব চললেও স্থানীয়ভাবে তা মীমাংসার চেষ্টা খুব একটা সফল হয়নি। তারা মনে করেন, প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের উদ্যোগে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

এদিকে সংঘর্ষের পর পুরো এলাকায় এক ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অনেক পরিবার এখনো আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বিশেষ করে যেসব পরিবার সরাসরি সংঘর্ষের মধ্যে পড়েছিল, তারা নতুন করে কোনো সহিংসতার আশঙ্কা করছেন।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে স্থানীয়দেরও শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, গ্রামীণ সমাজে আধিপত্য বিস্তার ও ব্যক্তিগত বিরোধ প্রায়ই সহিংস রূপ নেয়, যা স্থানীয় সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

লোহাগড়ার বাঁকা গ্রামের এই সংঘর্ষ আবারও মনে করিয়ে দিল, ছোট একটি বিরোধ কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে বড় সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। স্থানীয়রা আশা করছেন, প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ এবং সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর ঘটবে না এবং গ্রামটি আবারও শান্ত পরিবেশে ফিরে আসবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত