দ্বিতীয় সপ্তাহে ইরান যুদ্ধ, বাড়ছে আঞ্চলিক উত্তেজনা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৮ মার্চ, ২০২৬
  • ৬১ বার
দ্বিতীয় সপ্তাহে ইরান যুদ্ধ

প্রকাশ: ০৮ মার্চ  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এক উত্তপ্ত বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাত। গত কয়েক দিনের সামরিক হামলা, পাল্টা হামলা এবং রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠেছে। একাধিক শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নিহত হওয়ার পরও ইরান আত্মসমর্পণের কোনো ইঙ্গিত দেয়নি; বরং দেশটি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে সংঘাতটি দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করলেও এর সমাপ্তি নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকেই পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যায়। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি-সহ দেশটির বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকর্তার মৃত্যু ঘটে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে। এই ঘটনার পর পশ্চিমা বিশ্লেষকদের অনেকেই ধারণা করেছিলেন যে তেহরানের ক্ষমতাকাঠামো দ্রুত ভেঙে পড়বে এবং ইরান হয়তো অল্প সময়ের মধ্যেই আত্মসমর্পণে বাধ্য হবে।

কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নিয়েছে। ইরানের নেতৃত্ব আত্মসমর্পণের পরিবর্তে প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেশটির সামরিক বাহিনী এবং নিরাপত্তা কাঠামো এখনও সক্রিয় রয়েছে এবং বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ধারাবাহিকভাবে পাল্টা হামলা চালানো হচ্ছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ইসরাইলের সামরিক স্থাপনা, পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটির নাম উঠে আসছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিক বক্তব্যে দাবি করেছেন, যৌথ বিমান হামলার ফলে ইরানের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার মতে, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সামরিক নেতৃত্ব বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, ইরানি কর্তৃপক্ষ আলোচনায় বসার আগ্রহ দেখালেও এখন সময় অনেকটাই পেরিয়ে গেছে।

তবে যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা নিয়ে ভিন্ন মূল্যায়ন করছেন অনেক আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক। তাদের মতে, ইরান প্রচলিত অর্থে সরাসরি সামরিক বিজয় অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ করছে না। বরং দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে চাপে রাখাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। বিভিন্ন বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে ইরান যুদ্ধক্ষেত্রকে দীর্ঘায়িত করার কৌশল গ্রহণ করেছে।

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. এইচ. এ. হেলার মনে করেন, ইরান এমন এক কৌশল অনুসরণ করছে যেখানে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রতিপক্ষের সামরিক ব্যয় এবং রাজনৈতিক চাপ বাড়তে থাকবে। তার মতে, ইরান হয়তো সরাসরি জয় পাবে না, তবে প্রতিপক্ষের সম্ভাব্য বিজয়কে অনিশ্চিত করে তুলতে পারবে। এই কৌশল ইতোমধ্যে আংশিকভাবে কার্যকর হচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।

ফ্রান্সের সিয়ঁসপো বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্রের অধ্যাপক নিকোল গ্রাজেউস্কির মতে, ইরানের ড্রোন হামলা কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার জন্য নয়; এর একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক দিকও রয়েছে। ধারাবাহিক হামলার মাধ্যমে প্রতিপক্ষ দেশের নাগরিকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করা এবং তাদের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করাই এই কৌশলের অংশ।

ইসরাইলি সূত্রের হিসাব অনুযায়ী, ইরানের কাছে আড়াই হাজারের বেশি আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং কয়েক হাজার ড্রোন রয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা, এখন পর্যন্ত সেই অস্ত্রভাণ্ডারের খুব অল্প অংশই ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হলে সংঘাতের মাত্রা আরও বাড়তে পারে।

এই সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব। মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল পরিবহন হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে সামান্যতম অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। ইতোমধ্যে তেলের বাজারে মূল্য ওঠানামা শুরু হয়েছে এবং বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

সামরিক শক্তির দিক থেকেও ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আন্তর্জাতিক সামরিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সক্রিয় সেনাসদস্যের সংখ্যা ছয় লাখেরও বেশি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ সরাসরি সেনাবাহিনীতে এবং বড় একটি অংশ বিপ্লবী গার্ড বাহিনীতে যুক্ত রয়েছে, যারা দেশের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে।

এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র বা প্রভাবাধীন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতিও এই সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই গোষ্ঠীগুলো সংঘাতে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত হলে পুরো অঞ্চল আরও বড় আকারের অস্থিতিশীলতার মুখে পড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক মহলেও এই যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এই সংঘাতকে বড় ধরনের ভুল বলে উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন, এ ধরনের সামরিক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তার মতে, মিত্র দেশগুলো ভুল করলে সেটি প্রকাশ্যে বলা এবং সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

অন্যদিকে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেৎস সতর্ক করে বলেছেন, ইরানকে কোনোভাবেই প্রক্সি যুদ্ধের ক্ষেত্র বানানো উচিত হবে না। তার মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও প্রতিবেশী দেশগুলোর উদ্দেশে বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় কোনো দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার না করা হলে সেই দেশগুলো নিরাপদ থাকবে। তার এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর প্রতি একটি সতর্ক সংকেত হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান এই সংঘাত এখন শুধু একটি আঞ্চলিক সামরিক লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি ধীরে ধীরে বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ কত দিন চলবে, অথবা কীভাবে শেষ হবে—এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত। তবে বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে এই সংঘাতের প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত