প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন বক্তব্য সামনে এসেছে। ইরানের শক্তিশালী সামরিক সংগঠন ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশটি অন্তত ছয় মাস পর্যন্ত তীব্র যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সামরিক সক্ষমতা ধরে রেখেছে। আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলি মোহাম্মদ নাইনি এক বিবৃতিতে এই দাবি করেন।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে নাইনির এই মন্তব্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ধারাবাহিক হামলার পর অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মনে করেছিলেন, ইরানের সামরিক শক্তি দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তবে আইআরজিসি মুখপাত্রের বক্তব্যে স্পষ্ট করা হয়েছে যে ইরান এখনো দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাইনির এই দাবি সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া মূল্যায়নের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন যে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক অভিযান অত্যন্ত সফল হয়েছে এবং তেহরানের সামরিক কাঠামো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।
চলতি সপ্তাহে দেওয়া এক বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এই সংঘাতে বড় ব্যবধানে জয়লাভ করবে। তিনি দাবি করেন, তাদের অভিযানে ইরানের সামরিক শক্তির বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে ইরানের পক্ষ থেকে দেওয়া সর্বশেষ বক্তব্য সেই মূল্যায়নের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরেছে।
আইআরজিসি মুখপাত্র আলি মোহাম্মদ নাইনি বলেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী কেবল প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে নেই, বরং প্রয়োজনে দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো সামরিক ও লজিস্টিক প্রস্তুতি তাদের রয়েছে। তার মতে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে বাইরে থেকে যে ধারণা তৈরি করা হচ্ছে তা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যের মাধ্যমে ইরান একদিকে তার অভ্যন্তরীণ জনমতকে শক্ত করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিপক্ষকে একটি রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছে। কারণ যুদ্ধের সময় সামরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রকাশ্য বক্তব্য অনেক সময় কৌশলগত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অংশ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে আইআরজিসি একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর গঠিত এই বাহিনী কেবল একটি সামরিক সংগঠনই নয়; বরং দেশের নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করে। সামরিক কার্যক্রমের পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আইআরজিসির প্রভাব কেবল সামরিক খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। ইরানের অর্থনীতি, শিক্ষা এবং রাজনীতির বিভিন্ন স্তরেও এই সংস্থার উপস্থিতি রয়েছে। ফলে আইআরজিসির কোনো বক্তব্য সাধারণত রাষ্ট্রীয় অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবেই বিবেচিত হয়।
বর্তমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরান ও তার প্রতিপক্ষদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যেখানে দাবি করছে যে তাদের হামলায় ইরানের সামরিক শক্তি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেখানে তেহরান বলছে তারা এখনও দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম।
এদিকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করে বলছেন, এই ধরনের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ এই অঞ্চলে সামান্য উত্তেজনাও দ্রুত বিস্তৃত আকার ধারণ করার ইতিহাস রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে বাইরে থেকে সঠিক তথ্য পাওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ সংঘাতে জড়িত দেশগুলো প্রায়ই নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী দেখানোর চেষ্টা করে। ফলে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার জন্য বিভিন্ন সূত্রের তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে আইআরজিসির সর্বশেষ এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে ঘিরে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ইরান যদি সত্যিই দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখে, তাহলে এই সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। আর যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের দাবি সঠিক হয়, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত ভিন্ন দিকে মোড় নিতে পারে।
বর্তমানে তাই আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি রয়েছে এই সংঘাতের পরবর্তী গতিপ্রকৃতির দিকে। কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে সামনে এসেছে।