প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা ও সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথেও পড়তে শুরু করেছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন বা বিএসসির সাতটি জাহাজ বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন সমুদ্রপথে অবস্থান করছে। এর মধ্যে একটি জাহাজ সংযুক্ত আরব আমিরাতের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর জেবেল আলি বন্দরে আটকে রয়েছে, আর বাকি ছয়টি জাহাজ বিভিন্ন দেশে নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
পরিস্থিতি ঘিরে নৌপরিবহন খাতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সার্বক্ষণিক নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক রুটে চলাচল করা এসব জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বিএসসি সূত্রে জানা গেছে, বহরের এমভি “বাংলার জয়যাত্রা” বর্তমানে দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দরে অবস্থান করছে। জাহাজটিতে ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিক রয়েছেন। নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী জাহাজটি পণ্য খালাসের পর কুয়েতের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা ছিল, যেখানে সালফার পরিবহনের জন্য নতুন কার্গো নেওয়ার কথা ছিল। তবে পণ্য খালাস সম্পন্ন হওয়ার পরও জাহাজটি জ্বালানি সংগ্রহ করতে না পারায় বন্দর ছাড়তে পারছে না বলে জানা গেছে।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক জানিয়েছেন, বহরের একটি জাহাজ ছাড়া অন্য কোনো জাহাজ বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে নেই। অধিকাংশ জাহাজ নিরাপদ রুটে অবস্থান করছে এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি জাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের প্রথম অগ্রাধিকার। এজন্য জাহাজের ক্রুদের সতর্ক অবস্থানে থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং নিয়মিত তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
গত অক্টোবরে বাণিজ্যিকভাবে যাত্রা শুরু করা এমভি বাংলার জয়যাত্রা বিএসসির বহরের একটি তুলনামূলক নতুন সংযোজন। আন্তর্জাতিক বাল্ক কার্গো পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত এই জাহাজটি বিভিন্ন দেশ থেকে বিভিন্ন ধরনের পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত থাকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে জাহাজটির অবস্থান নিয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
বিএসসি ও মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বহরের অন্যান্য জাহাজও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুটে পণ্য পরিবহন করছে। এমভি নবযাত্রা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছে। এমটি বাংলার অগ্রদূত রয়েছে কানাডায়। এমটি বাংলার অগ্রগতি অবস্থান করছে সিয়েরা লিওনে। এমভি বাংলার প্রগতি রয়েছে সেনেগালে। এমটি বাংলার অগ্রযাত্রা পাকিস্তানে এবং এমভি বাংলার অর্জন অবস্থান করছে রাশিয়ায়। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এসব জাহাজ বর্তমানে নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে এবং তাদের কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক রুটে চলাচলকারী এসব জাহাজ মূলত বিভিন্ন ধরনের বাল্ক কার্গো পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদিও এগুলো সরাসরি জ্বালানি তেল পরিবহন করে না, তবুও দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় তাদের একটি পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে। কারণ দেশের জ্বালানি আমদানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু কার্যক্রমে বিএসসি সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে।
এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসির জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থায় বিএসসি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আউটসোর্সিং ব্যবস্থার মাধ্যমে বড় আকারের মাদার ভেসেলের সহায়তায় জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থায় সহায়তা দিয়ে থাকে বিএসসি। ফলে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে চলাচলকারী এসব জাহাজের কার্যক্রম দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গেও পরোক্ষভাবে যুক্ত।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে পারস্য উপসাগর অঞ্চলের সমুদ্রপথ বিশ্বব্যাপী জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হলো হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল ও জ্বালানি এই সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এই অঞ্চলে কোনো ধরনের সংঘাত বা উত্তেজনা তৈরি হলে তা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ বা সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিলে অনেক সময় জাহাজগুলোকে বিকল্প রুট ব্যবহার করতে হয় বা নিরাপদ বন্দরে অপেক্ষা করতে হয়। এর ফলে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতিও কিছুটা ধীর হয়ে যায়।
এদিকে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিএসসির বহরের সাতটি জাহাজই সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে এবং এগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক রুটে পণ্য পরিবহন করে আয় করে থাকে। এসব জাহাজ ক্রয়ের জন্য নেওয়া ঋণ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। মোট ১৫ বছর মেয়াদি এই ঋণের কিস্তি পরিশোধ কার্যক্রম শুরু হয়েছে ২০২৫ সাল থেকে।
এ অবস্থায় কোনো জাহাজ দুর্ঘটনায় পড়লে বা দীর্ঘ সময় কার্যক্রম বন্ধ থাকলে তা বিএসসির জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিদিন একটি জাহাজের ভাড়া গড়ে প্রায় ২০ হাজার মার্কিন ডলার।
গত অর্থবছরে রাষ্ট্রায়ত্ত এই শিপিং সংস্থা প্রায় ৩০০ কোটি টাকা নিট মুনাফা অর্জন করেছে। সেই আয়ের একটি বড় অংশ ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যয় করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে বহরের জাহাজগুলো নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক রুটে পরিচালনা করা বিএসসির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষ বলছে, জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে প্রতিটি জাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে।
বিশ্ব রাজনীতির অস্থিরতার প্রভাব যে সমুদ্রপথের বাণিজ্যেও পড়তে পারে, বর্তমান পরিস্থিতি সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। আর সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত জাহাজগুলোর নিরাপদ অবস্থান নিশ্চিত করা এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হয়ে উঠেছে।