প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তা সংকটের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলেও। এই পরিস্থিতির কারণে ঢাকা থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গন্তব্যে একের পর এক ফ্লাইট বাতিল করছে বিভিন্ন এয়ারলাইনস। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ দিনে রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মোট ৩৬৭টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
মঙ্গলবারও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ৩২টি ফ্লাইট বাতিলের কথা জানিয়েছে। ফলে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত সময়ে ফ্লাইট বাতিলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে যারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মসূত্রে বা অন্য কাজে নিয়মিত যাতায়াত করেন।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা কাওছার মাহমুদ জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যে নিরাপত্তা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে আকাশপথে। ওই সময় ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান তাদের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। এখনো বেশ কয়েকটি দেশের আকাশসীমা আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
এই কারণে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলো তাদের ফ্লাইট পরিচালনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিকল্প রুট ব্যবহার করা সম্ভব না হওয়ায় সরাসরি ফ্লাইট বাতিল করতে হচ্ছে। ফলে ঢাকা থেকে এসব দেশের উদ্দেশে নির্ধারিত বহু ফ্লাইট বাতিল হয়েছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিনে ফ্লাইট বাতিলের সংখ্যা প্রতিদিনই উল্লেখযোগ্য ছিল। ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম দিনে ২৩টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়। পরদিন ১ মার্চ বাতিল হয় ৪০টি ফ্লাইট। ২ মার্চ বাতিল হয় ৪৬টি ফ্লাইট, যা ওই সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যা। এরপর ৩ মার্চ ৩৯টি এবং ৪ মার্চ ২৮টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়।
পরবর্তী দিনগুলোতেও পরিস্থিতি খুব একটা উন্নতি হয়নি। ৫ মার্চ বাতিল হয় ৩৬টি ফ্লাইট এবং ৬ মার্চ বাতিল করা হয় ৩৪টি ফ্লাইট। ৭ মার্চ ও ৮ মার্চ উভয় দিনই বাতিল হয় ২৮টি করে ফ্লাইট। ৯ মার্চ বাতিল হয় ৩৩টি ফ্লাইট এবং সর্বশেষ ১০ মার্চ বাতিল হয়েছে আরও ৩২টি ফ্লাইট।
এই ধারাবাহিক ফ্লাইট বাতিলের ফলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন প্রবাসী শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে যারা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কর্মরত বা সেখানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তাদের অনেকেই বিমানবন্দরে এসে জানতে পারছেন যে তাদের ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ফলে অনেক যাত্রীকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে অথবা নতুন করে টিকিটের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।
বিমানবন্দরে দেখা গেছে, অনেক যাত্রী ফ্লাইট বাতিলের খবর পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার বিকল্প ফ্লাইটের জন্য চেষ্টা করছেন। তবে সব সময় যে সহজে বিকল্প ফ্লাইট পাওয়া যাচ্ছে, এমনও নয়। ফলে অনেকে কয়েকদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বাধ্য হচ্ছেন।
এদিকে বিমান সংস্থাগুলো জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং যাত্রীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। আকাশপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অনেক রুটে ফ্লাইট চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার মধ্যে অনেক ফ্লাইট এই অঞ্চলের ওপর দিয়ে চলাচল করে। তাই এই অঞ্চলে নিরাপত্তা সংকট তৈরি হলে বিশ্বজুড়েই বিমান চলাচলে প্রভাব পড়ে।
ঢাকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ফ্লাইট পরিচালিত হয়। সেখানে কাজ করেন বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসী। ফলে এই অঞ্চলে যেকোনো অস্থিরতা বাংলাদেশের বিমান চলাচল ও যাত্রী পরিবহনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
বর্তমান পরিস্থিতি কতদিন স্থায়ী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ধীরে ধীরে ফ্লাইট চলাচলও স্বাভাবিক হয়ে আসবে। এরই মধ্যে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের নিয়মিতভাবে তাদের ফ্লাইটের সর্বশেষ তথ্য যাচাই করে বিমানবন্দরে আসার পরামর্শ দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের ওপর এর প্রভাব আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকতে পারে। তবে সব পক্ষই আশা করছে, দ্রুত পরিস্থিতি স্থিতিশীল হবে এবং আকাশপথে স্বাভাবিক কার্যক্রম আবারও শুরু করা সম্ভব হবে।
বর্তমান সংকটের মধ্যে যাত্রীদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই বিমান চলাচল পরিচালনা করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই পরিস্থিতি পুরোপুরি নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত কিছু ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত থাকার সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে।