প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নদীপথে যাত্রার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে এক মর্মান্তিক ঘটনা। রাজধানীর একটি স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দ্বাদশ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে যাত্রীবাহী লঞ্চের কেবিনে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত দুজনকে গ্রেফতার করেছে। ভুক্তভোগী বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ঘটনাটি ঘটেছে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার তমুরদ্দিন লঞ্চঘাট থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা একটি যাত্রীবাহী লঞ্চে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই শিক্ষার্থী তার পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে ঢাকায় ফেরার জন্য লঞ্চে ওঠেন। তার বাবা তাকে নিরাপদে ভেবে একটি নির্দিষ্ট কেবিনে উঠিয়ে দেন। কিন্তু যাত্রাপথেই ঘটে যায় এক ভয়াবহ ঘটনা, যা পুরো পরিবারকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ৮ মার্চ দুপুরে ভুক্তভোগীকে হাতিয়ার তমুরদ্দিন লঞ্চঘাট থেকে ফারহান-০৪ নামের একটি লঞ্চের ৩২৮ নম্বর কেবিনে উঠিয়ে দেন তার বাবা। একই সময় ওই লঞ্চে ওঠেন দুই ব্যক্তি, যাদের নাম মোহাম্মদ সাকিব উদ্দিন ও মোহাম্মদ নুরুজ্জামান মিঠু। কিছু সময় পর তারা ওই শিক্ষার্থীর কেবিনের দরজায় নক করে নিজেদের পরিচয় দিয়ে জানান যে তারা ভুক্তভোগীর বাবাকে চেনেন।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, তারা শিক্ষার্থীর কাছে একটি মোটরসাইকেল কেনার জন্য বহন করা কিছু টাকা নিরাপদে রাখার অনুরোধ করেন। সরল বিশ্বাসে শিক্ষার্থী তাদের কথায় সম্মতি দেন এবং টাকা কেবিনে রাখতে দেন। এরপর কৌশলে তারা কেবিনে প্রবেশ করে ভেতরে বসে পড়েন।
একপর্যায়ে কথাবার্তার সময় অভিযুক্তদের একজন শিক্ষার্থীকে কুপ্রস্তাব দেয়। শিক্ষার্থী তাতে রাজি না হওয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ রূপ নেয়। অভিযোগ অনুযায়ী, অভিযুক্তরা শিক্ষার্থীর মুখ ও গলা চেপে ধরে তাকে জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণে আনে। এ সময় অন্য অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর মোবাইল ফোন নিয়ে কেবিনের বাইরে চলে যায় এবং কেবিনের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এরপর কেবিনের ভেতরে শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ সময় শিক্ষার্থী সাহায্যের জন্য চিৎকার করার চেষ্টা করলে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে তিনি প্রতিরোধ করতে পারেননি বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার পর রাতের দিকে অভিযুক্তরা আবার কেবিনে প্রবেশ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। তখন শিক্ষার্থী আবারও চিৎকার করার চেষ্টা করলে ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে তাকে আবারও ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর শিক্ষার্থী শারীরিক ও মানসিকভাবে মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েন।
পরবর্তীতে পরিবার বিষয়টি জানতে পেরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শরণাপন্ন হয়। মঙ্গলবার ভুক্তভোগীর ভাই বাদী হয়ে রাজধানীর কোতোয়ালি থানায় দুই অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহ্ মো. ফয়সাল আহমেদ জানিয়েছেন, অভিযোগ পাওয়ার পরপরই পুলিশ দ্রুত অভিযান শুরু করে। তদন্তের ভিত্তিতে অভিযুক্ত দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়েছে এবং আদালতে হাজির করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ভুক্তভোগী বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং তার চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চলছে এবং সংশ্লিষ্ট সব তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এই ঘটনা সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই নদীপথে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। বিশেষ করে একাকী নারী যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেকে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের নৌপথে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করেন। এসব যাত্রায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লঞ্চের কেবিনে এমন অপরাধের ঘটনা যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করতে পারে। তাই ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন।
মানবাধিকার কর্মীরাও এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, যেকোনো ধরনের যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার এবং কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা এবং আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এই ঘটনার পর আবারও প্রশ্ন উঠেছে গণপরিবহনে যাত্রীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর। বিশেষ করে নারী যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত নজরদারি, নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালুর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তারা ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছেন। তাদের দাবি, এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হোক যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।