প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে যখন সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা ধরনের আলোচনা চলছে, তখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ে আশ্বস্ত করেছেন বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাট এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে নিত্যপণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সংঘাতের কিছু প্রভাব থাকলেও তা স্বল্পমেয়াদে বাজারে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে না বলে তিনি মনে করেন।
মঙ্গলবার দুপুরে সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নে এক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন। সেখানে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য সরকারের ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়। এই কর্মসূচির মাধ্যমে ওই ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের তিনটি গ্রামের মোট ৬৯৭ জন উপকারভোগীর হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেওয়া হয়।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বিশ্বরাজনীতিতে যে অস্থিরতা চলছে, বিশেষ করে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার সংঘাত, তা অবশ্যই বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যের ওপর কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এই সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী না হয়, তাহলে বাংলাদেশের বাজারে তার বড় ধরনের প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা খুব কম।
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি বড় অংশ সমুদ্রপথে পরিচালিত হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে নৌপথে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। তখন আমদানি-নির্ভর পণ্যের ক্ষেত্রে কিছুটা চাপ তৈরি হতে পারে। তবে স্বল্প সময়ের মধ্যে বা কয়েক দিনের মধ্যে এমন প্রভাব পড়ার আশঙ্কা নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
মন্ত্রী আরও বলেন, বাজার পরিস্থিতি সব সময় নজরদারির মধ্যে রাখা হচ্ছে। দেশের মানুষ যাতে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির শিকার না হয়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থাগুলো কাজ করছে। প্রয়োজন হলে বাজার নিয়ন্ত্রণে আরও পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নে আয়োজিত ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং এলাকার অনেক সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন। সেখানে মন্ত্রী বলেন, সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হলো নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করা এবং তাদের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সুলভ মূল্যে নিশ্চিত করা। ফ্যামিলি কার্ড সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
তিনি জানান, নতুন সরকার গঠনের মাত্র ২১ দিনের মধ্যেই এই কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। এটি সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ বলেও তিনি উল্লেখ করেন। মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার ধাপে ধাপে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই কর্মসূচি বিস্তৃত করবে যাতে আরও বেশি মানুষ এর সুবিধা পেতে পারেন।
ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিবারগুলো সরকার নির্ধারিত দামে কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারবেন। এতে বাজারে পণ্যের দাম কিছুটা বাড়লেও নিম্নআয়ের মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না বলে আশা করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হিসেবে কাজ করবে। অনেক পরিবার আছে যারা সীমিত আয়ের কারণে বাজারের বাড়তি দামের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে এই ধরনের উদ্যোগ তাদের জন্য কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনবে বলে তারা মনে করেন।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক পরিস্থিতি অস্থির হলে তার প্রভাব কোনো না কোনোভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে পড়ে। জ্বালানি তেল, খাদ্যশস্য ও পরিবহন খরচের পরিবর্তনের মাধ্যমে সেই প্রভাব বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে পৌঁছায়। তবে কোনো সংঘাত যদি স্বল্প সময়ের মধ্যে শেষ হয়ে যায়, তাহলে বাজারে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সাধারণত দেখা যায় না।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আমদানি-নির্ভর পণ্যের একটি বড় অংশ রয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি, ভোজ্যতেল, গমসহ অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা সরাসরি প্রভাব ফেলে। তাই সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে থাকে।
বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং কোনো ধরনের কৃত্রিম সংকট বা অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি প্রতিরোধ করা। তিনি বলেন, ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে যাতে সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো সমস্যা সৃষ্টি না হয়।
তিনি আরও বলেন, দেশের মানুষকে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে এবং সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজারে আস্থা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন সাধারণ মানুষ মনে করেন যে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে, তখন অযথা মজুত বা আতঙ্কজনিত কেনাকাটা কমে যায়। এতে বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সহজ হয়।
সুনামগঞ্জের এই কর্মসূচিতে মন্ত্রীর বক্তব্য সেই আস্থা তৈরির একটি প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজার পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের স্পষ্ট বার্তা সাধারণ মানুষের উদ্বেগ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সচেষ্ট রয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নজরে রেখেই প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।