লবণের কেজি চার টাকা, কুতুবদিয়ার চাষিরা বিপর্যস্ত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১১ মার্চ, ২০২৬
  • ৪ বার
লবণের কেজি চার টাকা

প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণ উৎপাদন বহু মানুষের জীবিকা ও ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু চলতি মৌসুমে লবণের অস্বাভাবিক দরপতনে উপকূলের লবণ চাষিদের জীবনে নেমে এসেছে গভীর অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে কুতুবদিয়া উপজেলার লবণ মাঠগুলোতে এখন হতাশা আর দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। মাঠে উৎপাদিত লবণের দাম এমনভাবে কমে গেছে যে উৎপাদন খরচই উঠছে না। ফলে হাজার হাজার চাষি এখন চরম লোকসানের মুখে পড়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন।

স্থানীয় চাষি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে মাঠপর্যায়ে প্রতি মণ লবণের দাম ১৬০ থেকে ১৭০ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। অথচ জমি লিজ, শ্রমিকের মজুরি, পলিথিন, পানি ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতি মণ লবণ উৎপাদনে ব্যয় পড়ে প্রায় ৩০০ টাকার মতো। অর্থাৎ প্রতিমণ লবণে প্রায় অর্ধেকেরও বেশি লোকসান গুনতে হচ্ছে চাষিদের। হিসাব অনুযায়ী, বাজারে লবণের কেজি দাঁড়াচ্ছে প্রায় চার টাকার কিছু বেশি, যা উৎপাদকদের জন্য কার্যত ধ্বংসাত্মক।

উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ঘুরে দেখা গেছে, অনেক লবণ মাঠেই এখন উৎপাদন চলছে ঠিকই, কিন্তু চাষিদের মুখে নেই সেই আগের উচ্ছ্বাস। বরং রয়েছে দুশ্চিন্তা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা। চলতি মৌসুমে উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে প্রায় ছয় হাজার একর জমিতে লবণ চাষ করছেন প্রায় সাড়ে চার হাজার চাষি। কিন্তু গত মৌসুমে লবণের দাম না পাওয়ায় এবার অন্তত পাঁচশ একর জমি পতিত পড়ে আছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

দক্ষিণ ধুরুং ইউনিয়নের লবণ চাষি কামাল জানান, গত বছর লবণ উৎপাদনে বিপুল লোকসান গুনতে হয়েছে। চার কানি জমিতে লবণ চাষ করে প্রায় এক লাখ টাকা ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, উৎপাদন খরচ বেড়েছে কিন্তু বাজারদর কমে গেছে। শ্রমিকের মজুরি, পলিথিন ও অন্যান্য খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক সময় ধারদেনা করতে হয়। সেই দেনা শোধ করার আগেই আবার নতুন মৌসুম শুরু হয়। ফলে অনেক চাষি এবার জমি লিজ না নিয়ে পতিত রেখেছেন।

চাষিদের অভিযোগ, বাজারে লবণের দাম কমে যাওয়ার ফলে তাদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সামনে ঈদুল ফিতরকে ঘিরে সাধারণত এই সময় গ্রামীণ অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি থাকে। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। কামাল বলেন, লবণের দাম এত কমে যাওয়ায় ঈদের কেনাকাটাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

আলী ফকির ডেইল এলাকার লবণ মাঠে কাজ করা আরেক চাষি ছোটন জানান, ব্যবসায়ীরা মাঠ থেকে প্রতিমণ লবণ কিনছেন মাত্র ১৬০ থেকে ১৭০ টাকায়। তিনি বলেন, গত বছর তিন কানি জমিতে লবণ চাষ করে প্রায় দেড় লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। এরপরও এবার কিছু জমিতে চাষ করেছেন এই আশায় যে দাম হয়তো বাড়বে। কিন্তু মৌসুমের মাঝামাঝি এসে দেখা যাচ্ছে দাম আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চাষিদের মতে, লবণ উৎপাদনে খরচের তুলনায় বাজারদর একেবারেই অযৌক্তিক। তারা অভিযোগ করেন, সরকার নির্ধারিত ন্যায্য মূল্য মাঠপর্যায়ে কার্যকর করা হচ্ছে না। পাশাপাশি বিদেশ থেকে লবণ আমদানির সম্ভাবনা নিয়েও তারা উদ্বিগ্ন। চাষিদের দাবি, লবণ আমদানি বন্ধ রেখে দেশীয় উৎপাদকদের সুরক্ষা দিতে হবে এবং একটি কার্যকর লবণ বোর্ড গঠন করা জরুরি।

অন্যদিকে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, মাঠে যে দাম দেওয়া হয় তা মূলত বড় লবণ মিলগুলোর ওপর নির্ভর করে। উত্তর ধুরুং ইউনিয়নের লবণ ব্যবসায়ী হোছাইন জানান, নারায়ণগঞ্জ ও খুলনা অঞ্চলের লবণ মিলগুলো যে দাম নির্ধারণ করে, সেই দামের ভিত্তিতেই মাঠপর্যায়ে লবণ কেনা হয়। তিনি বলেন, বর্তমানে প্রতিমণ লবণের দাম ১৬০ থেকে ১৭০ টাকার মধ্যে রয়েছে। তবে বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় এই দাম আরও কমে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

তিনি আরও জানান, মাঠ থেকে লবণ কিনে মিল পর্যন্ত পৌঁছাতে পরিবহন, শ্রমিক, ঘাট খরচসহ প্রায় ৬০ টাকার মতো অতিরিক্ত ব্যয় হয়। ফলে ব্যবসায়ীরাও অনেক সময় ঝুঁকি নিয়ে লবণ কিনতে বাধ্য হন। তবুও চাষিদের অভিযোগের মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের।

উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতিতে লবণ চাষের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। বিশেষ করে কক্সবাজার জেলার দ্বীপাঞ্চলগুলোতে এই পেশার ওপর নির্ভর করে হাজার হাজার পরিবার। মহেশখালী ও কুতুবদিয়া এলাকায় লবণ উৎপাদন বহু বছরের ঐতিহ্য। এখানকার জলবায়ু ও ভৌগোলিক অবস্থান লবণ উৎপাদনের জন্য উপযোগী হওয়ায় এই শিল্প স্থানীয় মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ বলেন, কুতুবদিয়া ও মহেশখালীর মানুষের প্রধান পেশা লবণ উৎপাদন এবং মৎস্য আহরণ। বর্তমানে মাঠে লবণের কেজি চার টাকার কিছু বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে, যা চাষিদের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক।

তিনি বলেন, অতীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে লবণ আমদানির একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যা স্থানীয় উৎপাদকদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ভবিষ্যতে যাতে চাষিরা ন্যায্য মূল্য পান, সে জন্য সংসদে একটি লবণ বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান তিনি। তাঁর মতে, একটি শক্তিশালী নীতিমালা ও বাজার ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লবণ উৎপাদন ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নীতিগত অসামঞ্জস্যের কারণে প্রায়ই উৎপাদকরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন। দীর্ঘমেয়াদে এই সমস্যা সমাধানের জন্য উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং সরাসরি বাজার সংযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এদিকে মাঠে লবণ উৎপাদন অব্যাহত থাকলেও চাষিদের চোখে এখন ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা। অনেকেই বলছেন, যদি এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকে তবে আগামী মৌসুমে আরও বেশি জমি পতিত পড়ে থাকতে পারে। এতে শুধু চাষিরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, বরং দেশের লবণ উৎপাদনেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

উপকূলের বিস্তীর্ণ লবণ মাঠে তাই এখন শুধু সাদা লবণের স্তূপ নয়, জমে উঠছে চাষিদের হতাশা ও উদ্বেগও। ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা না গেলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত