প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ময়মনসিংহের ভালুকায় বকেয়া বেতন ও ঈদ বোনাসের দাবিতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন একটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। বুধবার সকাল সাড়ে ১১টা থেকে শুরু হওয়া এ কর্মসূচিতে কয়েকশ শ্রমিক সড়কে অবস্থান নেন। এতে মহাসড়কের দুই পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে ভোগান্তিতে পড়েন দূরপাল্লার যাত্রী ও পণ্যবাহী পরিবহনের চালকরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভালুকা উপজেলার একটি শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত শেফার্ড গ্রুপ জিন্স লিমিটেড নামের পোশাক কারখানার শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া বেতন ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। শ্রমিকদের অভিযোগ, ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন, ঈদ বোনাস এবং বাৎসরিক ছুটির টাকা এখনো তাদের দেওয়া হয়নি। কর্তৃপক্ষ ১০ মার্চের মধ্যে এসব পাওনা পরিশোধের আশ্বাস দিলেও নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ফলে ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা শেষ পর্যন্ত মহাসড়কে নেমে বিক্ষোভ শুরু করেন।
বুধবার দুপুর পর্যন্ত শ্রমিকরা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন এবং তাদের দাবি দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। দুপুর ২টা পর্যন্ত পরিস্থিতি অপরিবর্তিত ছিল এবং সড়কে যান চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ে। এতে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ এবং ময়মনসিংহ থেকে ঢাকাগামী যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। অনেক যাত্রী ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে পড়েন, যার ফলে ভোগান্তি চরমে পৌঁছায়।
শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যার মধ্যে কাজ করে আসছেন। তাদের দাবি, প্রায়ই সময়মতো বেতন দেওয়া হয় না এবং বিভিন্ন পাওনা আদায়ে আন্দোলনের আশ্রয় নিতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে সামনে ঈদুল ফিতর থাকায় তারা আরও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। কারণ পরিবার-পরিজনের জন্য ঈদের বাজার করা এবং গ্রামে যাওয়ার প্রস্তুতির জন্য বেতন ও বোনাস অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
কারখানার সুইং সেকশনে কর্মরত শ্রমিক লিপি আক্তার বলেন, ঈদ সামনে চলে এসেছে। সবারই কেনাকাটা করার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু এখনো আমরা ফেব্রুয়ারির বেতন পাইনি। ঈদ বোনাস কিংবা বাৎসরিক ছুটির টাকাও দেওয়া হয়নি। তিনি জানান, গতকাল কারখানার জেনারেল ম্যানেজার শ্রমিকদের আশ্বাস দিয়েছিলেন যে আজ কথা বলে বেতন পরিশোধের ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু বুধবার সকালে কারখানায় এসে তারা দেখেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত নেই এবং কোনো সিদ্ধান্তও জানানো হয়নি। এতে শ্রমিকদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়।
কাটিং সেকশনের কর্মী শান্ত বলেন, তিনি প্রায় তিন বছর ধরে এই কারখানায় কাজ করছেন। তার মতে, কিছুদিন ধরে কারখানায় নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে এবং শ্রমিকদের পাওনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, শ্রমিকরা অনেক ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি মেনে নিয়েছেন। কিন্তু ঈদের আগে বেতন ও বোনাস না পেলে তারা পরিবারের কাছে কীভাবে ফিরবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। তার ভাষায়, প্রতিটি শ্রমিকেরই পরিবার রয়েছে এবং তাদের দায়িত্ব রয়েছে। তাই পাওনা টাকা দ্রুত পরিশোধ করা ছাড়া অন্য কোনো সমাধান নেই।
অবরোধের ফলে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। দূরপাল্লার বাস, ট্রাক এবং বিভিন্ন পণ্যবাহী যানবাহন দীর্ঘ সময় ধরে সড়কে আটকে থাকে। অনেক যাত্রী বিকল্প রাস্তা খুঁজতে চেষ্টা করেন, তবে অধিকাংশেরই গন্তব্যে পৌঁছাতে বিলম্ব ঘটে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পরিবহন চালকরাও এ পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনী, ভালুকা থানা পুলিশ এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ উপস্থিত হয়। তারা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন এবং একই সঙ্গে কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেন।
ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-৫ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গোপীনাথ কানজিলাল জানান, শ্রমিকদের দাবির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে একটি সমাধান বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তার আশা, আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে।
এদিকে কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোকলেছুর রহমান জানিয়েছেন, শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা পরিশোধের বিষয়ে মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, কারখানার মালিকের সঙ্গে কথা হয়েছে এবং আশা করা হচ্ছে বৃহস্পতিবারের মধ্যেই শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধ করা হবে। তিনি আরও বলেন, শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানে কর্তৃপক্ষ আন্তরিকভাবে কাজ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের পোশাক শিল্পে শ্রমিকদের বেতন ও অন্যান্য পাওনা নিয়ে মাঝে মাঝে যে অস্থিরতা দেখা যায়, তা দ্রুত সমাধান করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ এই শিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি এবং এখানে কর্মরত লাখো শ্রমিকের জীবিকা এ খাতের ওপর নির্ভরশীল।
ভালুকার এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও শ্রমিকদের আর্থিক নিরাপত্তা এবং সময়মতো বেতন পরিশোধের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে উৎসবের আগে শ্রমিকদের পাওনা নিশ্চিত করা না গেলে তাদের জীবনে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতি কীভাবে গড়ায় এবং শ্রমিকদের দাবি কত দ্রুত বাস্তবায়ন করা হয়, সেদিকেই এখন সবার নজর। শ্রমিকরা আশা করছেন, কর্তৃপক্ষ দ্রুত তাদের পাওনা পরিশোধ করবে এবং তারা স্বাভাবিকভাবে কাজে ফিরতে পারবেন।