প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে দেশের লাখো মানুষের ঘরে ফেরার যাত্রা নিরাপদ, দ্রুত এবং স্বস্তিদায়ক করতে বিভিন্ন প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে সরকার। ঈদকে কেন্দ্র করে সড়ক ও সেতুতে যাত্রীচাপ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সেতু বিভাগ বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছে। ঘরমুখো মানুষের সুবিধার্থে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সেতুগুলোর উভয় প্রান্তে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন বা ইটিসি টোল বুথ চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে যানবাহন দ্রুত পারাপার হতে পারে এবং টোল প্লাজায় দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি না হয়।
বুধবার রাজধানীতে সেতু বিভাগের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক সমন্বয় সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন সেতু বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন সেতু ও সড়ক ব্যবহার করে যাতায়াতকারী যাত্রীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন ভ্রমণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই সমন্বয় সভার আয়োজন করা হয়।
সভায় সেতু বিভাগের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক এবং সাইট অফিসের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন এবং সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সভায় যুক্ত হন এবং ঈদযাত্রা ব্যবস্থাপনা নিয়ে মতামত দেন।
সভাপতির বক্তব্যে সেতু সচিব বলেন, পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশের মানুষ পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে বাড়ি ফিরবেন। এ সময় সড়ক ও সেতুগুলোতে যাত্রী ও যানবাহনের চাপ অনেক বেড়ে যায়। তাই এই যাত্রাকে যতটা সম্ভব নিরাপদ, আরামদায়ক ও নির্বিঘ্ন করতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী দেশের সাধারণ মানুষের ঈদযাত্রা যেন নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় হয় সে বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন, যাতে ঈদের সময় কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা বড় ধরনের যানজট সৃষ্টি না হয়।
সেতু সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ আরও জানান, সেতুর উভয় প্রান্তে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন সিস্টেম চালু রাখলে ইটিসি কার্ড ব্যবহারকারী যানবাহন দ্রুত পারাপার হতে পারবে। এতে সময় সাশ্রয় হবে এবং টোল প্লাজায় গাড়ির দীর্ঘ সারি কমে আসবে। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন, যেন সব ইটিসি বুথ কার্যকরভাবে চালু রাখা হয় এবং সেগুলোতে প্রযুক্তিগত কোনো ত্রুটি না থাকে।
সভায় জানানো হয়, ঈদকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন মহাসড়ক ও সেতুর আশপাশে নির্মাণাধীন প্রকল্পগুলোর কাজের সামগ্রী যত্রতত্র ফেলে রাখা যাবে না। নির্মাণসামগ্রী বা ভারী যন্ত্রপাতি যাতে যান চলাচলে কোনো বাধা সৃষ্টি না করে সে বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে বলা হয়েছে। প্রয়োজন হলে দ্রুত এসব সরিয়ে সড়ক ও সেতু এলাকা পরিষ্কার রাখতে হবে।
এছাড়া ঈদের সময় সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এজন্য অতিরিক্ত জনবল মোতায়েন করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে যাত্রীবাহী যানবাহনে অতিরিক্ত যাত্রী বহন রোধে কঠোর নজরদারি চালানোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
সভায় আরও আলোচনা হয়, দেশের গুরুত্বপূর্ণ সেতুগুলোর টোল প্লাজা ও বুথে সিসিটিভি ক্যামেরা সচল রাখা হবে। সার্ভেইল্যান্স সিস্টেমের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেকশন এবং যান চলাচলের পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হবে। এর ফলে কোথাও যানজট বা কোনো সমস্যা তৈরি হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
টোল প্লাজাগুলোতে দ্রুত টোল আদায়ের সুবিধার্থে পর্যাপ্ত ভাঙতি টাকা রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ ঈদের সময় অনেক চালক দ্রুত টোল পরিশোধ করতে না পারায় লাইনে বিলম্ব ঘটে এবং এর ফলে যানজট তৈরি হয়। এই সমস্যা এড়াতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সভায় এলেঙ্গা এলাকায় নবনির্মিত বাস-বে ব্যবহারের বিষয়েও বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। মহাসড়কে যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করলে যানজট সৃষ্টি হয় এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। তাই নির্ধারিত বাস-বে ছাড়া অন্য কোথাও বাস না থামানোর জন্য সংশ্লিষ্ট চালকদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে সেতু বিভাগ স্থানীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসন এবং পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। ঈদযাত্রায় ব্যবসায়ী ও সাধারণ যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সভায় অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা জানান, প্রতি বছর ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ বড় শহরগুলো থেকে লাখ লাখ মানুষ দেশের বিভিন্ন জেলায় বাড়ি ফেরেন। এ সময় মহাসড়ক ও সেতুগুলোতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। তাই আগাম পরিকল্পনা এবং সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া নির্বিঘ্ন যাত্রা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সেতু বিভাগের উদ্যোগকে তাই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন পরিবহন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর টোল ব্যবস্থা এবং সড়ক ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে ঈদযাত্রা অনেকটাই স্বস্তিদায়ক হতে পারে।
ঈদ মানেই আনন্দ, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর উচ্ছ্বাস। সেই আনন্দের পথে যেন দীর্ঘ যানজট বা দুর্ঘটনা বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সে লক্ষ্যেই কাজ করছে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সেতু বিভাগ আশা করছে, সবাই ট্রাফিক আইন মেনে চললে এবং নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করলে এবারের ঈদযাত্রা হবে অনেক বেশি নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময়।