প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দরজায় কড়া নাড়ছে পবিত্র ঈদুল ফিতর, আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাজধানীসহ সারা দেশে বেড়েছে মানুষের কেনাকাটার তীব্র গতি। রাজধানীর অভিজাত শপিংমল, বিপণিবিতান থেকে শুরু করে ফুটপাতের ছোট ছোট দোকানগুলো—সবখানেই এখন উৎসবের আমেজ। শহরের মোড় থেকে মফস্বলের গলি, সর্বত্র চোখে পড়ে ক্রেতা-বিক্রেতাদের ব্যস্ততা। পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, ব্যাগ, ঘড়ি ও উপহারসামগ্রীর দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় জমে ওঠেছে।
বাণিজ্য সংশ্লিষ্টরা জানান, এবারের ঈদকে কেন্দ্র করে দেশের বাজারে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকার বাণিজ্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দুই বছর আগের মন্দাভাব কাটিয়ে এবার দেশীয় বিপণিবিতান ও ফুটপাতের দোকানগুলোতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। বিশেষ করে সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-বোনাস হাতে আসার পর বাজারে আগের তুলনায় সরবরাহ ও ক্রেতার চাহিদা বেড়েছে।
রাজধানীর নিউ মার্কেট, গাউছিয়া মার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড, বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্স এবং পুরান ঢাকার বিপণিবিতানগুলো ঘুরে দেখা গেছে, নারী ও পুরুষসহ বিভিন্ন শ্রেণির ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়। সন্ধ্যার পর বাজারে কেনাকাটার চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে। অনেকে পরিবারসহ একসঙ্গে মার্কেটে আসেন, বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের পোশাকের প্রতি আগ্রহ চোখে পড়ে।
বাণিজ্য সংশ্লিষ্টরা জানান, ঈদ মৌসুমে বছরের একটি বড় অংশের বিক্রি সম্পন্ন হয়। তাই ব্যবসায়ীরা আগে থেকেই প্রস্তুতি নেন। দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলো নতুন নকশার পোশাক বাজারে এনেছে, আর বিভিন্ন শপিং মলে বিদেশি ব্র্যান্ডের পোশাকও পাওয়া যাচ্ছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক শপিং মল ছাড়াও ফুটপাত ও অস্থায়ী বাজারগুলো এখন সাধারণ মানুষের আস্থার কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিউ মার্কেট সংলগ্ন রাস্তার ধারের দোকানগুলোতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ভিড় চোখে পড়ে। সেখানে ক্রেতারা সাধ্যের মধ্যে পছন্দের জিনিস খুঁজে নিতে ব্যস্ত। টি-শার্ট, জিন্স বা বাচ্চাদের রঙিন জামা সাজানো হয়েছে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের দোকানগুলোতে।
বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি নাজমুল হাসান মাহমুদ জানান, বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবার ব্যবসায়ীরা অনেকটা স্বস্তিবোধ করছেন। দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে ব্যবসায়িক পরিবেশে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তিনি বলেন, গত বছর সারা দেশে ঈদ ব্যবসা প্রায় ১৪০ থেকে ১৫০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ছিল। এবারের লক্ষ্য দুই লাখ কোটি টাকা, যা অর্জন সম্ভব বলে আশাবাদী ব্যবসায়ীরা।
নিউ মার্কেটের ফুটপাতে পোশাক ব্যবসায়ী মো. মাহবুব জানান, শুরুতে বিক্রি বেশি ছিল না, তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ক্রেতার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন প্রতিদিন রাত দুই থেকে তিনটা পর্যন্ত বাজারে ক্রেতা থাকে। গাউছিয়া মার্কেটের মেয়েদের পাইকারি থ্রি-পিস ব্যবসায়ী শামিম রহমান বলেন, অন্যান্য বছরের মতো এবারের ঈদও তাদের ব্যবসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। খুচরা ব্যবসায়ীদের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বিক্রি আশানুরূপ হচ্ছে।
পোশাকের পাশাপাশি গহনা ও প্রসাধনী কিনতে চাঁদনি চক ও গাউছিয়া মার্কেটে নারী ক্রেতাদের ভিড় চোখে পড়ার মতো। মেকআপ আইটেম থেকে ইমিটেশন গহনার বিক্রি কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। জুতার দোকানগুলোতেও ক্রেতার ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। বাটা, এপেক্সের মতো বড় ব্র্যান্ডের পাশাপাশি স্থানীয় কারিগরদের তৈরি জুতাও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকে আগেভাগেই প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার চেষ্টা করছেন, যাতে শেষ মুহূর্তের ভিড় এড়ানো যায়। পরিবারসহ একসঙ্গে মার্কেটে আসা অনেক ক্রেতা তাদের পছন্দের জিনিসগুলো কিনছেন। বেসরকারি চাকরিজীবী জুবায়ের আহমেদ বলেন, পরিবারের জন্য নতুন পোশাক কেনা ঈদের আনন্দের একটি অংশ, তবে দ্রব্যমূল্যের চাপের কারণে বাজেট সীমিত রাখতে হচ্ছে।
এবারের ঈদ বাজারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ডিজিটাল লেনদেন। নগদ টাকার পরিবর্তে মানুষ মোবাইল ব্যাংকিং ও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। বিভিন্ন ব্যাংক ও পেমেন্ট গেটওয়ে প্রতিষ্ঠান ছাড়াও অনলাইন শপিং প্ল্যাটফর্মগুলো ঘরে বসে কেনাকাটা করার সুবিধা দিচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও ক্রেতাদের নিরাপত্তার জন্য সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। নিউ মার্কেট থানার অস্থায়ী সাব কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বে থাকা এএসআই মাহমুদুল আলম জানান, নজরদারি বাড়ানোর ফলে বাজারে কোনো বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। মানুষ নির্ভয়ে কেনাকাটা করে বাড়ি ফিরছেন।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই বড় অঙ্কের লেনদেন হয়। পোশাকের পাশাপাশি জুতা, প্রসাধনী, ইলেকট্রনিক পণ্য, মিষ্টান্ন ও বিভিন্ন উপহারসামগ্রীর বাজারেও বিক্রি বেড়ে যায়। বণিক সমিতির নেতারা জানান, ঈদের আগে শেষ ৭ থেকে ১০ দিন বাজারে সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা যায়। এই সময় বিক্রির বড় অংশ সম্পন্ন হয়। তাই সামনে দিনগুলোতে কেনাকাটা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং শেষ মুহূর্তের চাপও এবারের ঈদ মৌসুমে ব্যবসার ভালো ফলাফল নিশ্চিত করবে।