প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের নারীদের জীবনের গল্প প্রায়শই সংগ্রাম ও সাহসিকতার গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। এমনই এক উদাহরণ চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ পৌরশহরের তানজিনা হকের। মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় মেয়ে হিসেবে জন্ম ও বেড়ে ওঠা তানজিনা স্বপ্নপূরণের পথে শুরু করেছিলেন মাত্র দুই হাজার টাকা মূলধনের ছোট উদ্যোগ নিয়ে। তিনি নারী উদ্যোক্তার চ্যালেঞ্জ ও সমাজের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ছিলেন।
তানজিনার শিক্ষাজীবন এসএসসির আগেই বাধ্যতামূলকভাবে শেষ হয়। তবে পরিবারের ভেতর থেকে এবং আশপাশের মানুষের সমালোচনা, অবহেলা ও সহযোগিতার অভাবের মধ্যে থেকেও তিনি হাল ছাড়েননি। শুরু হয় নারী পোশাকের ব্যবসা। প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও তানজিনা থেমে থাকেননি। আবারও দুই হাজার টাকা মূলধনে শুরু করেন হোমমেড খাবারের ব্যবসা। সমুসা, শিঙাড়া, মাষকলাইয়ের ডাল, আলুর চিপস ইত্যাদি নিজের হাতে তৈরি করে তিনি ‘Tanjina’s UnonGhor’ নামে ফেসবুক পেজের মাধ্যমে বিক্রি শুরু করেন।
প্রাথমিক সময়ে অর্ডার নিজেই সরবরাহ করতেন তানজিনা। ক্রমে স্থানীয় ডেলিভারি ব্যবস্থা ও কুরিয়ার সেবা ব্যবহার করে তার পণ্য দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে যায়। এমনকি প্রবাসীরা তার তৈরি খাবার বিদেশেও পাঠাতে শুরু করেন। দ্রুত ক্রেতাদের প্রশংসা ও ভালো সাড়া পেয়ে তিনি আবার পোশাকের ব্যবসাও শুরু করেন, ফেসবুকে ‘Trendy Butterfly Fashion House’ নামে একটি পেজ খোলেন।
তানজিনা হকের মতে, উদ্যোক্তা হওয়া শুধুমাত্র অর্থ উপার্জনের জন্য নয়, বরং নিজস্ব পরিচয় তৈরি এবং সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলার মাধ্যমও। তিনি বলেন, “উদ্যোক্তা হওয়া আমার জন্য সহজ ছিল না। প্রথমে পরিবার ও আশপাশের মানুষের সহায়তা বা উৎসাহ কম ছিল। তবে সফল নারী উদ্যোক্তা মুসকান নূর, নাসরিন আক্তার ও বৃষ্টি আমাকে মানসিক সমর্থন দিয়েছে। WE Reloaded ও Ladies Smile-এর মতো সংস্থাও আমার পথচলার সহায়ক হয়েছে।”
ছয় বছরের কঠোর পরিশ্রম ও সাহসিকতার মাধ্যমে তানজিনা হকের দুই হাজার টাকা মূলধনের ব্যবসা আজ ১৫ লাখ টাকার পুঁজি অর্জন করেছে। তার আয় দিয়ে সাত সদস্যের পরিবার চলে এবং নিজের সমস্ত খরচও পূর্ণ হচ্ছে। পাশাপাশি তিনি দেশের বিভিন্ন নামিদামি মেলায় অংশগ্রহণ করেছেন এবং মালয়েশিয়ার নারী উদ্যোক্তা মেলায় উপস্থিত থাকার সুযোগও পেয়েছেন। বর্তমানে তার ব্যবসা ‘Ministry of Commerce, Bangladesh’-এ নিবন্ধনপ্রাপ্ত।
তানজিনা বলেন, “ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা শেষ করে নিজের কিছু করা এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানো। উদ্যোক্তা হওয়া মানে শুধু অর্থ উপার্জন নয়, নিজের স্বাবলম্বিতা এবং অন্যদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।” তিনি আরও বলেন, প্রথম বড় অর্ডার সফলভাবে ডেলিভারি করতে পেরে নিজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। তিনি সকল নারীদের উৎসাহ দেন, “কোনো কাজই ছোট নয়, ভয় পেয়ে বসে থাকলে চলবে না; পরিশ্রম করতে হবে, লেগে থাকতে হবে—তবেই সফলতা আসবে।”
তানজিনা হকের গল্প একটি প্রমাণ যে, ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম এবং সঠিক সমর্থন থাকলে নারী উদ্যোক্তারা সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে এবং নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারেন। তার সংগ্রাম, সাহসিকতা ও সফলতার এই অভিজ্ঞতা দেশের নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।