প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞায় সাময়িক শিথিলতা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ইতোমধ্যে জাহাজে বোঝাই করা রাশিয়ার তেল ও জ্বালানি পণ্য আগামী ১১ এপ্রিল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি ও সরবরাহ করা যাবে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনার প্রেক্ষাপটে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে সম্ভাব্য বড় সংকট মোকাবিলায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে।
শুক্রবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক হামলার জবাবে ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের শৃঙ্খল ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয় এবং তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। এই সংকটের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়।
মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশনায় নেওয়া এই সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষার কৌশলগত অংশ। তিনি বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহে হঠাৎ ধাক্কা এলে বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে। তাই ইতোমধ্যে জাহাজে লোড করা রাশিয়ার তেল বিক্রির অনুমতি দিয়ে বাজারে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।” একই সঙ্গে ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা পদক্ষেপ এবং মধ্যপ্রাচ্যে আরও অস্থিতিশীলতার ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ১২ মার্চের মধ্যে যেসব রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য জাহাজে বোঝাই করা হয়েছে, সেগুলো আগামী ১১ এপ্রিল পর্যন্ত কোনো বাধা ছাড়াই আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করা যাবে। তবে নতুন করে তেল কেনাবেচা বা দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এই পদক্ষেপকে কেবল অস্থায়ী ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে ওয়াশিংটন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও ইরাকসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস রপ্তানি কার্যত স্থবির হয়ে যেতে পারে। এতে করে ইউরোপ ও এশিয়ার বহু দেশ জ্বালানি সংকটে পড়বে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং পরিবহন খাতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে রাশিয়ার তেল বাজারে প্রবাহিত রাখার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সরবরাহের ঘাটতি আংশিকভাবে পূরণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালে ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করার পর রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো। তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল সেই পদক্ষেপের অন্যতম প্রধান অংশ, যার লক্ষ্য ছিল মস্কোর অর্থনৈতিক শক্তি দুর্বল করা। কিন্তু বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সেই কঠোর অবস্থান সাময়িকভাবে নমনীয় করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য ইতোমধ্যেই অস্থিরতা দেখাতে শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ বিকল্প খুঁজতে থাকায় জ্বালানি খাতে চাপ বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত সাময়িকভাবে বাজারে স্বস্তি আনতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা অনেকটাই নির্ভর করবে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে উত্তেজনা কতটা বাড়ে বা কমে তার ওপর।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্যও এই পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলে আমদানি ব্যয় বাড়ে এবং তা সরাসরি জ্বালানি মূল্য, পরিবহন খরচ ও নিত্যপণ্যের দামে প্রভাব ফেলে। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংকটের সম্ভাবনা তৈরি হলে দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা থাকে। এই কারণে বিশ্ব পরিস্থিতির দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক মহল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এই সামুদ্রিক পথটি শুধু জ্বালানি নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি দীর্ঘ সময়ের জন্য এটি বন্ধ থাকে, তাহলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। সেই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের এই সাময়িক ছাড়কে একটি বাস্তবমুখী কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা জরুরি পরিস্থিতিতে বাজারকে স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। কারণ রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা পশ্চিমা ঐক্যের প্রশ্নে নতুন আলোচনা তৈরি করবে। একই সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নেওয়া কঠোর অবস্থান কতটা কার্যকর থাকবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে বিশ্ব জ্বালানি বাজার এখন এক অনিশ্চিত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, বৈশ্বিক শক্তির কৌশলগত সিদ্ধান্ত এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা মিলিয়ে আগামী কয়েক সপ্তাহ পরিস্থিতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই সাময়িক সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হয় এবং এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে কতটা স্বস্তি আসে, তা এখন সময়ই বলে দেবে।