প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া সাম্প্রতিক যুদ্ধকে অনেক বিশ্লেষক যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব বিস্তারের চূড়ান্ত প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি রোধের অজুহাত দিয়েই যুদ্ধে নেমেছে যুক্তরাষ্ট্র, তবে প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য পরিবর্তন করে নিজের প্রভাব বাড়ানো। এই অভিযান কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বরং স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময় থেকে শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির ধারাবাহিকতার সর্বশেষ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যে এই সংঘাত কেবল সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং বিশ্ব রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়বে। যুদ্ধের আড়ালে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা সীমিত করা হচ্ছে, যাতে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব আরও শক্তিশালী হয়। রাশিয়ার গণমাধ্যম আরটি-তে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে ফিওদর লুকিয়ানোভ বলেছেন, যুদ্ধের প্রকৃত লক্ষ্য পারমাণবিক অস্ত্র না হলেও আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধিই মূল উদ্দেশ্য। তিনি আরও জানান, মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা গত তিন দশকের রাজনৈতিক ও সামরিক বিবাদের ধারাবাহিকতা।
১৯৯১ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাকের বিরুদ্ধে অভিযান মধ্যপ্রাচ্যে নতুন শক্তির ভারসাম্য স্থাপনের সূচনা করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র একক প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে অঞ্চলজুড়ে সামরিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে। ২০০১ সালের নাইন ইলেভেনের পর বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের শুরু হয়। আফগানিস্তান ও ইরাকে সামরিক অভিযান, আরব বসন্ত, লিবিয়ায় হস্তক্ষেপ এবং সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘ সময় ধরে অস্থিতিশীলতার মধ্যে রয়েছে। প্রতিটি সংকট নতুন শক্তিকে সংঘাতে টানে এবং পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠে।
লুকিয়ানোভের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র ইরানকে দমন করা মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের একচেটিয়া প্রভাব নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সহজেই অঞ্চলে নিজের কূটনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাবে। তবে তিনি সতর্ক করে উল্লেখ করেন, ইরান যেমন বৃহৎ ও প্রভাবশালী রাষ্ট্র, তার সঙ্গে সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হতে পারে অঞ্চলটির স্থিতিশীলতার ওপর।
বিশ্লেষকরা আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের এই পদক্ষেপ শুধুমাত্র সাম্প্রতিক অস্থিরতার প্রতিক্রিয়া নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্র পুনর্গঠনের পরিকল্পিত প্রচেষ্টা। এতে প্রতিটি দেশকে নতুন করে অবস্থান নিতে হবে, এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তিত হবে। এই সংঘাতের কারণে অর্থনীতি, মানবিক অবস্থা ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বৃদ্ধির এই প্রচেষ্টা বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভূরাজনৈতিক শক্তি ভারসাম্য এবং সামরিক হুমকি নতুন করে নির্ধারিত হবে। তেহরানকে নিয়ন্ত্রণে আনা এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতা কমানো মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়িত্ব ফিরিয়ে আনতে না পারলেও মার্কিন এবং ইসরাইলি উদ্দেশ্য অনুযায়ী অঞ্চলে প্রভাব বাড়াতে সাহায্য করবে।