প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে সাম্প্রতিক এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলাকে ঘিরে। সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। দুইজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কাছে অবস্থিত Prince Sultan Air Base-এ এই হামলার ঘটনা ঘটে।
প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদপত্র The Wall Street Journal। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর পাঁচটি রিফুয়েলিং বা জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে সেগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়নি এবং বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত বিমানগুলো দ্রুত মেরামতের কাজ চলছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, হামলার সময় ঘাঁটিতে অবস্থানরত সামরিক সদস্যদের কেউ নিহত বা গুরুতর আহত হননি। তবুও ঘটনাটি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে উদ্বেগের মুখে ফেলেছে। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা নানা সময় বাড়লেও সরাসরি এমন হামলার ঘটনা তুলনামূলকভাবে বিরল।
সৌদি আরবের ওই ঘাঁটিটি দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে আকাশপথে অভিযান পরিচালনা এবং বিভিন্ন সামরিক বিমানকে মাঝপথে জ্বালানি সরবরাহের জন্য এখানকার রিফুয়েলিং বিমানগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই বিমানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা।
এই হামলার খবর সামনে আসার কিছু সময় পরই মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ইরানের উপকূলের কাছে অবস্থিত তেলসমৃদ্ধ দ্বীপ Kharg Island-এ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে।
এই হামলার বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump দাবি করেন, মার্কিন বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী বিমান হামলা পরিচালনা করেছে। তিনি বলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীর মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কমান্ড United States Central Command বা ইউএস সেন্টকম অত্যন্ত নিখুঁত পরিকল্পনার মাধ্যমে ওই অভিযানে অংশ নেয়।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার পোস্টে আরও বলেন, খারগ দ্বীপে অবস্থিত ইরানের প্রতিটি সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হয়েছে। তার ভাষায়, দ্বীপটি ইরানের “মুকুটের মণি” হিসেবে পরিচিত এবং সেখানে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামো ছিল। তবে তিনি উল্লেখ করেন, দ্বীপটির তেল অবকাঠামো এখনো লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি।
ট্রাম্প বলেন, তিনি এখনো দ্বীপটির তেল স্থাপনাগুলো ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেননি। তবে পরিস্থিতি যদি আরও উত্তপ্ত হয় এবং যদি কেউ আন্তর্জাতিক জলপথে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করার চেষ্টা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
বিশেষ করে তিনি উল্লেখ করেন, পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ Strait of Hormuz দিয়ে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা ব্যাহত হলে যুক্তরাষ্ট্র তা মেনে নেবে না। বিশ্ব বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এবং বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ এই প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে যে কোনো ধরনের অস্থিরতা বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা নতুন করে বাড়তে পারে। বিশেষ করে সৌদি আরবের মাটিতে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলার ঘটনা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতের পেছনে দীর্ঘদিন ধরে চলমান ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন আরও জটিল হয়ে উঠছে। একদিকে ইরান তার আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রাখতে চাইছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এই অঞ্চলে নিজেদের সামরিক ও কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করতে সচেষ্ট।
সৌদি আরবও এই পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। ফলে এই অঞ্চলে যেকোনো সামরিক উত্তেজনা সরাসরি সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে এখনো পর্যন্ত ইরানের পক্ষ থেকে এই হামলার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা হয়নি। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে এবং আশঙ্কা করছে, যদি উত্তেজনা আরও বাড়ে তাহলে তা বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
বিশ্ব রাজনীতির অস্থির এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক পরিস্থিতি যে কোনো সময় নতুন মোড় নিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। আর সেই কারণে কূটনৈতিক পর্যায়ে উত্তেজনা প্রশমনের উদ্যোগ নেওয়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।