প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর সংসদে বিরোধী দল অংশ নেবে বলে জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলাম। একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে সংসদে আলোচনা উত্থাপন করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি। রোববার সকালে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব মন্তব্য করেন।
দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকার পর সম্প্রতি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় থেকে খালাস পাওয়া জামায়াত নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলাম ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে প্রথম অধিবেশনে বক্তব্য দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার সংসদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ না ঘটলে হয়তো তিনি ফাঁসির সেল থেকে সংসদে এসে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পেতেন না। তার এই বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে। অধিবেশনের শুরুতেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ দেশি-বিদেশি কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যুতে শোকপ্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। সংসদ সদস্যরা শোকপ্রস্তাবে অংশ নিয়ে তাদের স্মরণ করেন এবং দেশের রাজনীতি ও সমাজে তাদের অবদানের কথা তুলে ধরেন।
এই অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণকে কেন্দ্র করে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে আলোচনার পরিবেশ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সংসদীয় রীতি অনুযায়ী নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন এবং সেই ভাষণের ওপর সংসদ সদস্যরা বিস্তারিত আলোচনা করেন। সেই আলোচনায় বিরোধী দল অংশ নেবে বলে জানিয়েছেন এ টি এম আজহারুল ইসলাম।
তিনি বলেন, সংসদে বিরোধী দলের দায়িত্ব হচ্ছে সরকারের কার্যক্রম নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা করা এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সামনে আনা। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা সেই সুযোগ তৈরি করে দেয়। তাই বিরোধী দল হিসেবে তারা সংসদে এই আলোচনায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেবে। তার মতে, সংসদে সক্রিয় বিতর্ক ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পরিবেশ আরও শক্তিশালী হতে পারে।
এ টি এম আজহার আরও জানান, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়টি সংসদে আলোচনা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তার মতে, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো ও সংবিধানের কিছু দিক নিয়ে নতুনভাবে ভাবার প্রয়োজন হতে পারে। এই বিষয়ে সংসদে আলোচনা হলে তা দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করবে।
তিনি বলেন, সংবিধান দেশের মূল আইন হলেও এটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পর্যালোচনা করা অস্বাভাবিক নয়। বিশ্বের অনেক দেশেই সময় অনুযায়ী সংবিধানে পরিবর্তন আনা হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও যদি প্রয়োজন হয় তবে তা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত। তবে সেই আলোচনা অবশ্যই গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এবং সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে হওয়া দরকার বলে মনে করেন তিনি।
সংসদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন। দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা কারাগারে ছিলেন তারা জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহকে অস্বীকার করতে পারবেন না। সেই সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তার প্রভাব তাদের জীবনে বড় পরিবর্তন এনেছে। তিনি বলেন, রাজনীতির বাস্তবতা কখনো কখনো ব্যক্তিগত জীবনের গতিপথও পাল্টে দেয়।
একই সঙ্গে তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার রাজনৈতিক সম্পর্কের কথাও স্মরণ করেন। জামায়াতে ইসলামীতে দায়িত্ব পালন করার সময় তিনি খালেদা জিয়ার সঙ্গে বিভিন্ন আন্দোলন ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন বলে জানান। তার মতে, খালেদা জিয়া দেশের রাজনীতিতে আপসহীন অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিলেন।
তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন সংকটময় মুহূর্তে খালেদা জিয়া দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। দেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে তিনি সব সময় দৃঢ় ছিলেন। তার রাজনৈতিক জীবন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে বলেও মন্তব্য করেন এ টি এম আজহারুল ইসলাম।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। বিশেষ করে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনার মাধ্যমে সংসদে সক্রিয় বিতর্কের পরিবেশ তৈরি হলে তা গণতান্ত্রিক চর্চাকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে।
সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতবিনিময় এবং বিতর্ক একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা সেই প্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেখানে সরকারের নীতি ও পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয় এবং বিরোধী দল তাদের মতামত তুলে ধরার সুযোগ পায়।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যদি সংসদে গঠনমূলক আলোচনা ও বিতর্কের পরিবেশ বজায় থাকে তবে তা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য ইতিবাচক বার্তা বয়ে আনতে পারে। একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার নিয়ে আলোচনা শুরু হলে তা ভবিষ্যতে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংলাপের পথও তৈরি করতে পারে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের কার্যক্রম এখনো শুরুর পর্যায়ে রয়েছে। আগামী দিনগুলোতে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা, বিভিন্ন বিল উত্থাপন এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিতর্কের মধ্য দিয়ে সংসদের কার্যক্রম আরও গতিশীল হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও নতুন করে সংলাপ ও আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। কারণ সংসদ এমন একটি জায়গা যেখানে দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো নিয়ে সরাসরি আলোচনা করা যায় এবং সমাধানের পথ খোঁজা সম্ভব হয়।
সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণকে কেন্দ্র করে যে আলোচনা শুরু হয়েছে তা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সংবিধান সংস্কার নিয়ে সম্ভাব্য আলোচনা আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের রাজনীতিকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।