সর্বশেষ :

রাশিয়ার ড্রোন সহায়তা নিয়ে জেলেনস্কির নতুন অভিযোগ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৫ মার্চ, ২০২৬
  • ৪ বার
রাশিয়ার ড্রোন সহায়তা

প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপজুড়ে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে রাশিয়া, ইরান এবং ইউক্রেনের সম্পর্ক। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট Volodymyr Zelenskyy সম্প্রতি দাবি করেছেন, ইরানকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর জন্য ব্যবহৃত ‘শাহেদ’ ড্রোন সরবরাহের বিষয়ে তিনি সরাসরি রাশিয়ার দিকে আঙুল তুলেছেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় এই মন্তব্য নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে এবং বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় সময় শনিবার ১৪ মার্চ মার্কিন সংবাদমাধ্যম CNN–এ প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এ বিষয়ে খোলামেলা বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে উপস্থাপক ছিলেন আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক ও সাংবাদিক Fareed Zakaria। সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি বলেন, এটি ‘শতভাগ সত্য’ যে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার সময় ইরান রাশিয়ার তৈরি শাহেদ ড্রোন ব্যবহার করেছে। তাঁর ভাষায়, আধুনিক যুদ্ধে ড্রোন এখন অত্যন্ত কার্যকর অস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং রাশিয়া সেই প্রযুক্তি বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

শাহেদ ড্রোন মূলত ইরানে তৈরি এক ধরনের আত্মঘাতী বা ‘লোইটারিং মিউনিশন’ ড্রোন, যা লক্ষ্যবস্তুর ওপর আঘাত হানার আগে আকাশে দীর্ঘ সময় ভেসে থাকতে পারে। প্রযুক্তিগতভাবে এটি তুলনামূলক সস্তা হলেও কার্যকারিতার দিক থেকে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্রের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুদ্ধক্ষেত্রে এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, কম খরচে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে সক্ষম হওয়ায় এই ধরনের ড্রোন আধুনিক যুদ্ধের কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নিয়েছে।

জেলেনস্কির বক্তব্য অনুযায়ী, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই রাশিয়া এই ড্রোন ব্যবহারে ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। ইউক্রেনের দাবি, ২০২২ সালের শরৎকাল থেকে রাশিয়া ইউক্রেনের বিভিন্ন শহর ও অবকাঠামোর ওপর হামলার জন্য হাজার হাজার শাহেদ ড্রোন ব্যবহার করেছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি অবকাঠামো এবং সামরিক স্থাপনায় এই ড্রোন হামলা উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি সৃষ্টি করেছে।

তিনি আরও বলেন, শুরুতে ইরান থেকে সরাসরি এই ড্রোন সরবরাহ করা হলেও পরে রাশিয়া নিজস্ব প্রযুক্তি ব্যবহার করে এগুলোর উৎপাদন শুরু করে। এতে করে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী আরও দ্রুত এবং বড় আকারে এই ড্রোন মোতায়েন করতে সক্ষম হয়েছে। জেলেনস্কির দাবি অনুযায়ী, একই প্রযুক্তি এখন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং সেটি বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ার পর দুই দেশ প্রযুক্তি ও সামরিক সরঞ্জাম বিনিময়ে আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। পশ্চিমা দেশগুলোও দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য ইরান থেকে ড্রোন সংগ্রহ করেছে। যদিও রাশিয়া ও ইরান উভয় দেশই অনেক ক্ষেত্রে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

এই প্রসঙ্গে মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিশ্লেষণও নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানে ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার একটি পরিকল্পিত কৌশলের অংশ হতে পারে। তাদের মতে, কম খরচে দ্রুত হামলা চালানোর জন্য এই ধরনের ড্রোন বর্তমানে বিভিন্ন দেশের সামরিক কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক যুদ্ধের ধরন গত এক দশকে দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে। আগে যেখানে ভারী অস্ত্র বা ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর বেশি নির্ভরতা ছিল, এখন সেখানে ড্রোন প্রযুক্তি যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। শাহেদ ধরনের ড্রোনের সাফল্য অনেক দেশকে একই ধরনের প্রযুক্তি উন্নয়নে উৎসাহিত করছে। এর ফলে ভবিষ্যতের সংঘাতে ড্রোন যুদ্ধ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে জেলেনস্কির অভিযোগ আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পশ্চিমা শক্তির ভূরাজনৈতিক অবস্থান—সবকিছু মিলিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এমন অবস্থায় রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ সামনে আসা কূটনৈতিক আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি কেবল আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয় নয় বরং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের সঙ্গেও জড়িত। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব ইতোমধ্যে বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। এখন যদি একই প্রযুক্তি অন্য অঞ্চলের সংঘাতে ব্যবহার হয়, তাহলে তার প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে।

এদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও ড্রোন ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, এই ধরনের অস্ত্র অনেক সময় বেসামরিক মানুষের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ড্রোন হামলা হলে সাধারণ মানুষের প্রাণহানির সম্ভাবনা বাড়ে। তাই ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক নীতিমালা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।

সব মিলিয়ে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সাম্প্রতিক মন্তব্য আবারও বৈশ্বিক রাজনীতির জটিল বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। রাশিয়া, ইরান এবং পশ্চিমা শক্তির মধ্যে চলমান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভবিষ্যতে কোন দিকে গড়াবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে একথা স্পষ্ট যে আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন প্রযুক্তি আগামী দিনগুলোতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে এবং সেই বাস্তবতা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত