সরবরাহ সংকটের মাঝে বাড়ছে সয়াবিন ও পাম তেলের দাম

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৫ মার্চ, ২০২৬
  • ৪ বার
সয়াবিন ও পাম তেলের দাম

প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভোজ্যতেলের বাজারে ক্রেতাদের জন্য একধরনের চাপের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। রমজান মাসের মাঝামাঝি থেকেই খুচরা বাজারে সয়াবিন ও পাম তেলের দাম চরমভাবে বেড়ে গেছে। শুধু দাম বেড়েছে তাই নয়, অনেক জায়গায় পাঁচ লিটারের বোতল পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে না। একই সঙ্গে কিছু দোকান এক গ্রাহককে সর্বোচ্চ এক বোতল তেল বিক্রি করছে, যাতে বেশির ভাগ ক্রেতাই প্রয়োজনীয় জিনিসটি পেতে পারে।

খুচরা বাজারের পরিস্থিতি অনুযায়ী, লিটারে সয়াবিন তেলের দাম ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি। স্বপ্ন ও মীনা বাজারের মতো চেইন শপে দেখা যাচ্ছে, ভোজ্যতেলের মজুত সীমিত এবং এক গ্রাহককে এক বোতল তেলের বেশি বিক্রি করা হচ্ছে না। এক লিটারের সয়াবিন তেলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) ১৯০–১৯৫ টাকা, আর পাঁচ লিটারের এমআরপি ৯২০–৯৫৫ টাকা। গত ৭ ডিসেম্বর থেকে এই দাম বজায় রয়েছে। তবে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) জানাচ্ছে, গত এক সপ্তাহে পাঁচ লিটারের বোতলের দাম ৩০ টাকা বেড়ে ৯৫০–৯৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৭–১০ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে বিক্রি হচ্ছে ১৮৫–১৯৩ টাকায়। একইভাবে খোলা পাম তেলের দাম ৬–১৩ টাকা বেড়ে ১৬৩–১৬৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

ঢাকার নিউ ইস্কাটনের দিলু রোডের দোকানদার রমিজ মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, “ডিলারদের কাছ থেকে আমরা তেল পাচ্ছি না। তাঁরা সরাসরি আমাদেরই এমআরপি দরে সরবরাহ করছেন। তেল না রাখলে গ্রাহক অন্য দোকানে চলে যাবে। তাই আমরা কম লাভ হলেও স্টক রাখছি। এক বোতল বিক্রি করে ৫–১০ টাকা লাভ না হলে সেটা আমাদের জন্য টেকসই নয়।

ক্রেতা সোহাগ মিয়া অভিযোগ করেন, “ছোট-বড় ব্যবসায়ী এক রকম। তারা এক ধরণের কৌশল ব্যবহার করে সরবরাহ সীমিত করে দাম বাড়াচ্ছে।” তবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলছেন, খুচরা দামের চেয়ে বেশি দাম রাখা শুধুমাত্র বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তিনি জানিয়েছেন, সিলেটের কিছু প্রান্তিক বাজারে এমআরপি দরেই তেল বিক্রি হচ্ছে এবং তিনি রোববার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে সরবরাহ পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখতে যাবেন।

দিলু রোডের চেইন শপ স্বপ্ন ও মীনা বাজারে লেখা রয়েছে, “স্টক সীমিত। সকল গ্রাহক সর্বোচ্চ ১ বোতল কিনতে পারবেন।” দোকানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এমআরপি চেয়ে বেশি দাম রাখা হচ্ছে না। আবার কারও কারও কাছে শুধু মেঘনা গ্রুপের ফ্রেশ ব্র্যান্ডের তেলই পাওয়া যাচ্ছে। বিসমিল্লাহ ট্রেডিংয়ের ম্যানেজার আবদুর রহমান জানাচ্ছেন, “রূপচাঁদা ও অন্যান্য কোম্পানির তেল আমরা চাইছি, কিন্তু সরবরাহ পাচ্ছি না। তাই ফ্রেশ ব্র্যান্ডের তেল বিক্রি করছি।”

সরকারের পক্ষ থেকে ভোজ্যতেলের সার্বিক সরবরাহ ও দামের পর্যালোচনা বৈঠক ৯ মার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বৈঠকে ভোজ্যতেল পরিশোধন কারখানার মালিকরা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) জানিয়েছে, দেশব্যাপী সয়াবিন ও পাম তেলের মজুত বর্তমানে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৯ টন। সাতটি প্রধান পরিশোধন কারখানা প্রতিদিন ৯,০৮৮ টন তেল বাজারে ছাড়ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশে ভোজ্যতেলের বার্ষিক চাহিদা ২৪–২৫ লাখ টন। স্থানীয়ভাবে চার লাখ টন তেল উৎপাদিত হয়। ব্যবসায়ীরা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকারের কাছে দাম সমন্বয়ের দাবি জানানো হচ্ছে, কিন্তু সরকার এখনও তাতে বিশেষ মনোযোগ দিচ্ছে না। দেশের শীর্ষস্থানীয় এক ভোজ্যতেল কোম্পানির কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, “আমরা তেল সরবরাহ করছি। বাজারে সংকটের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। তবে আমদানি পর্যাপ্ত নয়।”

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি টনে ১,০৮৩ মার্কিন ডলার, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় ৬ শতাংশ কমেছে। এই পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা সরকারের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, “ভোজ্যতেলের বর্তমান পরিস্থিতি মূলত সরকারের ওপর চাপ তৈরির জন্য। এটি একটি পুরোনো কৌশল, যা তারা বুঝতে পারলেই যথেষ্ট।”

বর্তমান পরিস্থিতি দেশের ক্রেতাদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সরবরাহ সীমিত হওয়া, দাম বাড়া এবং এক বোতল সীমা—সব মিলিয়ে রমজান মাসের বাজারে ভোজ্যতেল ক্রেতাদের জন্য প্রায় শোষণমূলক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। তবে সরকার, ব্যবসায়ীরা এবং ভোক্তাদের মধ্যে সমন্বয় এবং সরবরাহ বৃদ্ধি করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত