দিনাজপুরে খাল খনন কর্মসূচি উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬
  • ৩ বার
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের কৃষি, পরিবেশ ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে নতুন গতি দিতে আবারও খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি শুরু করছে সরকার। ক্ষমতায় আসার পর নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়নে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার অংশ হিসেবে আজ দিনাজপুরে একটি বৃহৎ খাল পুনঃখনন প্রকল্পের উদ্বোধন করতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার বলরামপুর সাহাপাড়া এলাকায় প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি খালের পুনঃখনন কাজের মাধ্যমে সারা দেশে একযোগে ‘খাল খনন কর্মসূচি ২০২৬’-এর আনুষ্ঠানিক সূচনা হবে।

সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা, পলি জমা এবং দখলের কারণে দেশের বহু খাল-নদী ভরাট হয়ে গেছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা এবং শুকনো মৌসুমে কৃষিজমিতে পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যেই নতুন করে খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে কৃষি উৎপাদন বাড়বে, জলাবদ্ধতা কমবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সকাল সোয়া ১০টার দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছাবেন। সেখান থেকে তিনি সরাসরি দিনাজপুর জেলার কাহারোল উপজেলার বলরামপুর এলাকায় যাবেন। বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে তিনি ‘সাহাপাড়া খাল’ পুনঃখনন কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন। এই খালের পুনঃখনন প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় একযোগে খাল খননের কার্যক্রম শুরু হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

উদ্বোধন অনুষ্ঠানের পর প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় জনগণের উদ্দেশে এক জনসভায় বক্তব্য দেবেন। সেখানে তিনি সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা, গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করার উদ্যোগ এবং পরিবেশবান্ধব প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়গুলো তুলে ধরবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি অনুযায়ী, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তিনি জনসভায় ভাষণ দেবেন।

সফরের অংশ হিসেবে বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে দিনাজপুর পৌরসভার উপশহরে অবস্থিত শেখ ফরিদ মডেল কবরস্থানে গিয়ে তিনি তাঁর নানা-নানি ও খালার কবর জিয়ারত করবেন। এরপর বিকাল পাঁচটায় দিনাজপুর সার্কিট হাউস চত্বরে সুধী সমাবেশ এবং ইফতার মাহফিলে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।

সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, খাল পুনঃখনন কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের মৃতপ্রায় বা ভরাট হয়ে যাওয়া খালগুলো পুনরুদ্ধার করা হবে। এতে কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা বৃদ্ধি পাবে এবং বর্ষাকালে পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা তৈরি হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং গ্রামীণ জীবনে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে।

খাল পুনরুদ্ধারের ফলে মাছ চাষ, হাঁস পালনসহ খালনির্ভর নানা অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার অনেক পরিবার সরাসরি খাল ও জলাশয়ের ওপর নির্ভরশীল। এসব খাল পুনরুজ্জীবিত হলে স্থানীয় মানুষ আবারও জলসম্পদ ব্যবহার করে আয় বাড়ানোর সুযোগ পাবে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে খাল খনন কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য রয়েছে। স্বাধীনতার পর দেশের কৃষি উৎপাদন বাড়ানো এবং গ্রামীণ অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খাল খননের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ১৯৭৭ সালে তাঁর নেতৃত্বে যে খাল খনন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল, তা দেশের কৃষি উন্নয়নে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।

সে সময় প্রায় তিন হাজার ৬৩৬ মাইল খাল খনন করা হয়েছিল। এই কর্মসূচির ফলে অনেক এলাকায় সেচ সুবিধা বৃদ্ধি পায় এবং কৃষি উৎপাদনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। কৃষি খাতে যে ‘সবুজ বিপ্লব’ সূচিত হয়েছিল, তার পেছনে এই খাল খনন উদ্যোগের বড় ভূমিকা ছিল বলে মনে করেন গবেষকরা।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওই সময় খনন করা অনেক খাল ভরাট হয়ে গেছে। কোথাও পলি জমে, আবার কোথাও অবৈধ দখলের কারণে এসব খাল কার্যকারিতা হারিয়েছে। ফলে বর্ষাকালে অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় এবং শুকনো মৌসুমে কৃষিজমিতে পানির সংকট দেখা দেয়। বর্তমান সরকার এই সংকট নিরসনের লক্ষ্যেই নতুন করে খাল খনন ও পুনঃখননের উদ্যোগ নিয়েছে।

সম্প্রতি দিনাজপুরে সাহাপাড়া-বলরামপুর খাল এলাকা পরিদর্শন করেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। পরিদর্শন শেষে তিনি জানান, এই কর্মসূচি শুধু খাল খননের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। খালের পাড় রক্ষা, প্রয়োজনীয় স্থানে বাঁধ নির্মাণ এবং খালপাড়ে বৃক্ষরোপণের মতো উদ্যোগও নেওয়া হবে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে।

তিনি আরও বলেন, খালের পানিকে বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যবহার করার পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে। এতে কৃষি উৎপাদন বাড়বে এবং স্থানীয় মানুষের জীবনমান উন্নত হবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) যৌথভাবে কাজ করবে।

দিনাজপুরে প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সফরকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং বিভিন্ন স্থানে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। তারা মনে করছেন, এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দিনাজপুরসহ উত্তরাঞ্চলের কৃষি খাত নতুন সম্ভাবনা পাবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক দেশে জলব্যবস্থাপনা উন্নয়নের জন্য খাল পুনরুদ্ধার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক পরিকল্পনা ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে খালগুলো পুনরুজ্জীবিত করা গেলে কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

আজ দিনাজপুর থেকে যে কর্মসূচির সূচনা হতে যাচ্ছে, সেটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষা ও টেকসই উন্নয়নের পথেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত