রোমাঞ্চকর জয়ে পাকিস্তানকে হারিয়ে সিরিজ জিতল বাংলাদেশ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬
  • ৩ বার
বাংলাদেশ পাকিস্তান সিরিজ জয়

প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রুদ্ধশ্বাস লড়াই, নাটকীয় শেষ ওভার এবং দর্শকদের শ্বাস বন্ধ করে রাখা মুহূর্ত—সব মিলিয়ে স্মরণীয় এক ম্যাচে পাকিস্তানকে হারিয়ে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ নিজেদের করে নিয়েছে বাংলাদেশ। শেষ ম্যাচে ১১ রানের জয়ে সিরিজ ২-১ ব্যবধানে নিশ্চিত করে মেহেদি হাসান মিরাজের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ দল। ব্যাট হাতে দুর্দান্ত শতক করা তানজিদ হাসান তামিম এই জয়ের প্রধান নায়ক হয়ে উঠেছেন। অন্যদিকে পাকিস্তানের হয়ে সালমান আগার দুর্দান্ত শতক সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দিতে পারেনি পাকিস্তান।

ম্যাচের শুরুতে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশ গড়ে তোলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ২৯০ রানের সংগ্রহ। এই বড় স্কোরের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল ওপেনার তানজিদ হাসান তামিমের দুর্দান্ত সেঞ্চুরি। তার ব্যাটে আসে ১০৭ রানের চমৎকার ইনিংস। ৯৮ বলে খেলা এই ইনিংসে ছিল ৬টি চার ও ৭টি বিশাল ছক্কা। আত্মবিশ্বাসী ব্যাটিং, নিখুঁত টাইমিং এবং আক্রমণাত্মক মনোভাব দিয়ে তিনি পাকিস্তানি বোলারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন।

এটি ছিল তানজিদের ওয়ানডে ক্যারিয়ারের প্রথম শতক। ৩১তম ম্যাচে এসে তিন অঙ্কের ম্যাজিক ফিগার স্পর্শ করে তিনি নিজের প্রতিভার প্রমাণ দেন। এর আগে তার সর্বোচ্চ স্কোর ছিল শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে করা ৮৪ রান। সেই সীমা পেরিয়ে এবার তিনি ক্যারিয়ারের নতুন মাইলফলক স্পর্শ করলেন এবং ম্যাচসেরার পুরস্কারও নিজের করে নিলেন।

তানজিদের ইনিংসকে সহায়তা করেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। দ্বিতীয় উইকেটে দুজন মিলে ৫৩ রানের একটি গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েন। শান্ত ৩৪ বলে ২৭ রান করেন এবং হারিস রউফের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে ফিরে যান। যদিও বড় ইনিংস খেলতে পারেননি, তবে তানজিদের সঙ্গে তার জুটি দলকে স্থিতিশীল ভিত্তি এনে দেয়।

মধ্যভাগে তাওহিদ হৃদয়ের ব্যাটিং বাংলাদেশকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যায়। তিনি ৪৪ বলে ৪৮ রান করে অপরাজিত থাকেন। তার ইনিংসটি ছিল দারুণ কার্যকর, যেখানে দ্রুত রান তুলে দলের স্কোরকে বড় সংগ্রহের দিকে নিয়ে যান। শেষ দিকে আফিফ হোসেনও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রান যোগ করেন। তিনি ৮ বলে ৫ রান করে অপরাজিত থাকেন। সব মিলিয়ে নির্ধারিত ৫০ ওভারে বাংলাদেশ ৫ উইকেটে ২৯০ রান সংগ্রহ করে।

পাকিস্তানের হয়ে হারিস রউফ তিনটি উইকেট নেন। তবে অন্য বোলাররা খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারেননি। ফলে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে রান তুলতে সক্ষম হন।

২৯১ রানের লক্ষ্য নিয়ে ব্যাট করতে নেমে পাকিস্তানের শুরুটা ছিল ভয়াবহ। বাংলাদেশের বোলারদের দুর্দান্ত আক্রমণে মাত্র ১৭ রান তুলতেই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট হারিয়ে বসে পাকিস্তান। সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল ম্যাচটি সহজেই বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকে যাবে।

কিন্তু পাকিস্তান ক্রিকেট দলের অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হলো অপ্রত্যাশিতভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা। সেই কাজটিই করেন সালমান আগা। এক প্রান্ত আগলে রেখে ধীরে ধীরে দলের রান বাড়াতে থাকেন তিনি। প্রথমে আব্দুল সামাদ ও ঘাজি ঘোরির সঙ্গে চতুর্থ উইকেটে ৫০ রানের একটি জুটি গড়ে ওঠে। এরপর ষষ্ঠ উইকেটে অভিষিক্ত সাদ মাসুদের সঙ্গে ৭৯ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েন সালমান।

এই জুটির মাধ্যমে পাকিস্তান ম্যাচে ফিরে আসে এবং বাংলাদেশের বোলারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করে। দর্শকদের মনে তখন আবারও প্রশ্ন জাগে, ম্যাচের ফল কোন দিকে যাবে।

সালমান আগা শেষ পর্যন্ত ৯৮ বলে ১০৬ রানের অসাধারণ একটি ইনিংস খেলেন। তার ইনিংসে ছিল ৯টি চার ও ৪টি ছক্কা। এটি ছিল তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারের তৃতীয় শতক। এক প্রান্তে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থেকে তিনি দলকে জয়ের সম্ভাবনার কাছাকাছি নিয়ে যান।

সালমান আউট হওয়ার পর পাকিস্তানের জয় পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তবে অলরাউন্ডার শাহিন শাহ আফ্রিদি শেষদিকে লড়াই চালিয়ে যান। অষ্টম উইকেটে তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ রান যোগ করেন এবং ম্যাচকে শেষ ওভার পর্যন্ত টেনে নিয়ে যান। শাহিন ৩৭ বলে ৩৮ রান করেন এবং শেষ বলে আউট হন।

ম্যাচের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্ত আসে শেষ দুই ওভারে। পাকিস্তানের জয়ের জন্য তখন দরকার ছিল ২৮ রান। ৪৯তম ওভারে মোস্তাফিজুর রহমানের বলে শাহিন আফ্রিদি দুইটি ছক্কা মারেন এবং ওই ওভারে মোট ১৪ রান তুলে পাকিস্তানের জয়ের আশা উজ্জ্বল করে তোলেন। পাকিস্তানি সমর্থকদের মধ্যে তখন জয়ের স্বপ্ন জেগে ওঠে।

শেষ ওভারে জয়ের জন্য পাকিস্তানের দরকার ছিল ১৪ রান। এই গুরুত্বপূর্ণ ওভারটি করতে আসেন তরুণ স্পিনার রিশাদ হোসেন। প্রথম দুই বলে কোন রান নিতে পারেননি শাহিন। তৃতীয় বলে দুই রান নিলে সমীকরণ দাঁড়ায় শেষ তিন বলে ১২ রান। তখনও ম্যাচের ফল নির্ধারিত ছিল না।

কিন্তু চতুর্থ বলটি ডট হওয়ার পর চাপ আরও বেড়ে যায়। পঞ্চম বলে আম্পায়ার একটি ওয়াইড সংকেত দিলে রিশাদ সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করেন। রিভিউতে দেখা যায় বলটি ওয়াইড নয়, ফলে সেটি ডট বল হিসেবে গণ্য হয়। সেই মুহূর্তেই পাকিস্তানের জয়ের আশা অনেকটাই শেষ হয়ে যায়।

শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান ৫০ ওভারে ২৭৯ রানেই অলআউট হয় এবং বাংলাদেশ ১১ রানের নাটকীয় জয় তুলে নেয়। বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে সফল বোলার ছিলেন তাসকিন আহমেদ। তিনি চারটি উইকেট শিকার করেন এবং পাকিস্তানের রান তোলার গতি বারবার থামিয়ে দেন।

এই জয়ের ফলে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ ২-১ ব্যবধানে জিতে নেয় বাংলাদেশ। সিরিজের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন তানজিদ হাসান তামিম ও নাহিদ রানা।

ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, এই সিরিজ জয় বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সাফল্য। তরুণ খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স, চাপের মধ্যে বোলারদের দৃঢ়তা এবং দলের সমন্বিত প্রচেষ্টা এই জয়ের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।

বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য এই জয় নিঃসন্দেহে বড় আনন্দের উপলক্ষ। নাটকীয় এই ম্যাচ প্রমাণ করে দিয়েছে, ক্রিকেটের সৌন্দর্যই হলো শেষ বল পর্যন্ত অনিশ্চয়তা। আর সেই অনিশ্চয়তার রোমাঞ্চে শেষ হাসিটা হাসল বাংলাদেশ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত