গাজায় বিমান হামলা, নিহত ১৩ জন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬
  • ৪ বার
গাজায় ইসরাইল বিমান হামলা

প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় আবারও রক্তাক্ত এক দিনের সাক্ষী হলো মধ্যপ্রাচ্য। ইসরাইলি বিমান হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে একজন গর্ভবতী নারী এবং নয়জন পুলিশ কর্মকর্তা রয়েছেন। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা গেছে, হামলায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১৪ জন। নতুন এই হামলার ঘটনায় গাজা উপত্যকায় আতঙ্ক ও শোকের আবহ আরও গভীর হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রোববার ভোররাতে গাজার মধ্যাঞ্চলের নুসাইরাত শরণার্থী শিবিরে একটি আবাসিক বাড়িতে বিমান হামলা চালানো হয়। আকস্মিক এই হামলায় মুহূর্তের মধ্যেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় বাড়িটি। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারান অন্তত চারজন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন প্রায় ৩০ বছর বয়সী এক দম্পতি এবং তাদের মাত্র ১০ বছর বয়সী ছেলে। একই ঘটনায় নিহত হন ওই পরিবারের গর্ভবতী নারী সদস্যও, যার গর্ভে যমজ সন্তান ছিল বলে জানিয়েছে স্থানীয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

গাজার আল-আকসা শহীদ হাসপাতালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলার পরপরই আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। অনেকের শরীরে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে এবং কয়েকজনের অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক। হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা আহতদের অনেকেই মারাত্মক আঘাত নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছেছেন। চিকিৎসক ও নার্সরা সীমিত চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়েই তাদের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

হামলার সময় পাশের বাড়িতে থাকা প্রতিবেশী মাহমুদ আল-মুহতাসেব বলেন, গভীর রাতে সবাই ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ করে প্রবল বিস্ফোরণের শব্দে তারা ঘুম থেকে জেগে ওঠেন। তিনি জানান, বিস্ফোরণ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে আশপাশের বাড়িগুলো কেঁপে ওঠে। তার ভাষায়, কোনো ধরনের পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই ক্ষেপণাস্ত্রটি এসে আঘাত হানে।

তিনি আরও বলেন, বিস্ফোরণের পরপরই চারদিকে ধোঁয়া ও ধ্বংসস্তূপ ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়রা আতঙ্কিত হয়ে বেরিয়ে আসেন এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারের চেষ্টা করেন। অনেকেই নিজের হাতে ইট-পাথর সরিয়ে আহতদের বের করে আনেন।

একই দিনে গাজার আরেকটি স্থানে হামলার ঘটনা ঘটে, যেখানে লক্ষ্যবস্তু ছিল একটি পুলিশ গাড়ি। গাজার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মধ্য গাজার আজ-জাওয়াইদা শহরের প্রবেশপথে দক্ষিণ-উত্তর ফিলাডেলফি করিডোর এলাকায় ওই হামলাটি চালানো হয়। এতে একটি পুলিশ যানবাহন সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ধ্বংস হয়ে যায়।

এই হামলায় নিহত হয়েছেন অন্তত নয়জন পুলিশ কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে গাজার মধ্যাঞ্চলের একজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা কর্নেল আইয়াদ আব ইউসুফও রয়েছেন বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নিহতদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে গাজার নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হামলাটি ছিল সরাসরি পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে পরিচালিত। এতে গাজার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর বড় ধরনের আঘাত হেনেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে এই দুই হামলার বিষয়ে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাতে সময় নিচ্ছে ইসরাইলি সামরিক কর্তৃপক্ষ।

গাজা উপত্যকা দীর্ঘদিন ধরেই সংঘাত, অবরোধ এবং মানবিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সেখানে সহিংসতা নতুন করে বেড়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ এই অঞ্চলে প্রতিটি হামলাই সাধারণ মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো বহুবার সতর্ক করে বলেছে, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সামরিক হামলা চালালে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি থাকে। বিশেষ করে শরণার্থী শিবিরগুলোতে হাজার হাজার মানুষ অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করেন। ফলে সেখানে যে কোনো হামলা বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

গাজার স্বাস্থ্যখাতের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলমান সংঘাতের কারণে হাসপাতালগুলো ইতোমধ্যেই মারাত্মক চাপের মধ্যে রয়েছে। চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট, বিদ্যুৎ সমস্যাসহ নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেই চিকিৎসা সেবা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। নতুন করে আহত মানুষের সংখ্যা বাড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, প্রতিদিনের জীবন এখন তাদের জন্য অনিশ্চয়তায় ভরা। কখন কোথায় হামলা হবে তা কেউই জানেন না। অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যেতে বাধ্য হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকেও বারবার সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সংগঠন গাজায় বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সব পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

তবে এখন পর্যন্ত স্থায়ী শান্তির কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। প্রতিদিনই নতুন করে হামলা, পাল্টা হামলা এবং প্রাণহানির খবর আসছে। ফলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ ক্রমেই বাড়ছে।

গাজার নুসাইরাত শরণার্থী শিবিরের এই সাম্প্রতিক হামলা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকেই। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা জীবনগুলো শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং একটি অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটের প্রতিচ্ছবি।

বিশ্লেষকদের মতে, স্থায়ী শান্তির জন্য শুধু সামরিক সমাধান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন রাজনৈতিক সমাধান, কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং মানবিক সহায়তার সমন্বিত প্রচেষ্টা। অন্যথায় গাজায় এমন দুঃখজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি থামানো কঠিন হয়ে পড়বে।

বর্তমানে উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে এবং আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে সম্ভাব্য আরও হতাহতের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে।

গাজা উপত্যকার মানুষের জন্য প্রতিটি নতুন দিন যেন অনিশ্চয়তার আরেকটি অধ্যায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর প্রতিটি বিস্ফোরণের শব্দ তাদের মনে করিয়ে দেয়, যুদ্ধের বাস্তবতা কতটা নির্মম হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত