প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মায়ানমার দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সংঘাত এবং সামরিক শাসনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটিতে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামো কার্যত ভেঙে পড়ে। সেই অস্থিরতার মধ্যেই নতুন করে নির্বাচন আয়োজন করে সামরিক জান্তা। সেই নির্বাচনের ফলাফলকে ভিত্তি করে সোমবার প্রথমবারের মতো পার্লামেন্ট অধিবেশনে বসেছে দেশটি।
সংবাদ সংস্থা এএফপির সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, এই অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন সামরিক সমর্থিত নির্বাচনে জয়ী হওয়া আইনপ্রণেতারা। তবে এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে বিতর্ক ও সমালোচনা এখনো থামেনি। গণতন্ত্রপন্থী রাজনীতিক এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করছেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে সামরিক সরকার নিজেদের শাসনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
সোমবার সকালে রাজধানীর সংসদ ভবনে অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনে অংশ নেওয়া সংসদ সদস্যদের বড় একটি অংশ এসেছে সামরিক সমর্থিত রাজনৈতিক দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি থেকে। দলটি দীর্ঘদিন ধরেই দেশটির সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। এ ছাড়া সংসদের এক-চতুর্থাংশ আসন সরাসরি সামরিক বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত রয়েছে, যা মায়ানমারের সংবিধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
অধিবেশন শুরুর কিছু সময় পরই পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ পিপলস অ্যাসেম্বলিতে স্পিকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ইউএসডিপির নেতা খিন ই স্পিকার নির্বাচিত হন। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর সংসদের কার্যক্রম সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য পরিচালনা করেন।
বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে ২০২১ সালের বহুল আলোচিত সামরিক অভ্যুত্থান। ২০২০ সালের সাধারণ নির্বাচনে গণতন্ত্রপন্থী দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছিল। দলটির নেতৃত্বে ছিলেন নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী নেত্রী অং সান সু কyi। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার কিছুদিন পরই সামরিক বাহিনী ব্যাপক ভোট জালিয়াতির অভিযোগ তোলে এবং নির্বাচন বাতিল করে দেয়।
এরপর ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে এবং সু কিসহ সরকারের অনেক শীর্ষ নেতাকে আটক করে। পরে তার দলকে নিষিদ্ধ করা হয় এবং দেশজুড়ে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন শুরু হয়। সেই সময় থেকেই মায়ানমার এক ধরনের গৃহযুদ্ধের মধ্যে পড়ে যায়, যেখানে সেনাবাহিনী ও বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে।
সামরিক সরকার গত পাঁচ বছরে দেশটিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এরপর আন্তর্জাতিক চাপের মুখে জান্তা সরকার ধাপে ধাপে নতুন নির্বাচনের আয়োজন করে। গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে কয়েক ধাপে সেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তবে গণতন্ত্রপন্থী পর্যবেক্ষকদের মতে, এই নির্বাচন ছিল একপাক্ষিক এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে পরিচালিত।
সমালোচকদের অভিযোগ, নির্বাচনের সময় সরকারবিরোধী সমালোচনা প্রায় পুরোপুরি নিষিদ্ধ ছিল। অনেক বিরোধী নেতা কারাবন্দি ছিলেন অথবা নির্বাসনে চলে যেতে বাধ্য হন। ব্যালটে মূলত জান্তার ঘনিষ্ঠ বেসামরিক দলগুলোই প্রাধান্য পেয়েছে। ফলে নির্বাচনের ফলাফল আগে থেকেই অনেকটা অনুমেয় ছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
এই নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে গঠিত নতুন সংসদ যখন অধিবেশনে বসে, তখন একই সময় নির্বাসিত কিছু নির্বাচিত সংসদ সদস্য সমান্তরাল একটি অধিবেশন আয়োজন করেন। তারা দাবি করেন, ২০২০ সালের নির্বাচনের ভিত্তিতেই তাদের সরকার এখনো বৈধ।
এই নির্বাসিত প্রতিনিধিদের নেতৃত্ব দিচ্ছে তথাকথিত ছায়া সরকার ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট। সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দুয়া লাশি লা একটি অনলাইন বৈঠকে বলেন, সামরিক সরকার যে নির্বাচন আয়োজন করেছে তা জনগণকে বিভ্রান্ত করার একটি প্রচেষ্টা।
তার ভাষায়, এই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব দেখানো হয়নি। বরং সামরিক সরকার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য একটি রাজনৈতিক নাটক মঞ্চস্থ করছে। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এই নির্বাচনকে বৈধতা না দেওয়ার আহ্বান জানান।
মায়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশের বড় একটি অংশ এখনো বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এসব অঞ্চলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে নতুন সংসদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের বড় অংশই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সামরিক বাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, এই নতুন পার্লামেন্টের মাধ্যমে সামরিক সরকার তাদের শাসনকে একটি সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে আনতে চায়। এতে করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
এদিকে দেশটির সামরিক শাসনের সর্বোচ্চ নেতা মিন অং হ্লাইংকে নিয়ে নতুন রাজনৈতিক জল্পনা তৈরি হয়েছে। কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, তিনি সামরিক পোশাক ত্যাগ করে বেসামরিক প্রেসিডেন্টের পদ গ্রহণ করতে পারেন। আগামী মাসে যখন নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে, তখন এই সম্ভাবনা আরও পরিষ্কার হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
মায়ানমারের সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন সংসদের উভয় কক্ষের সদস্যদের ভোটে। কিন্তু সংসদের অধিকাংশ সদস্যই যদি সামরিক সমর্থক বা সরাসরি সেনাবাহিনীর প্রতিনিধি হন, তাহলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফলও অনেকটা অনুমেয় হয়ে যায় বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
সোমবারের অধিবেশন শেষে স্পিকার খিন ই সাংবাদিকদের বলেন, কে প্রেসিডেন্ট হবেন তা এখনই অনুমান করা কঠিন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় সামরিক বাহিনীর প্রভাবই প্রধান হয়ে থাকবে।
অধিবেশন শুরুর আগে সংসদ ভবনের ভেতরে এক ভিন্ন দৃশ্যও লক্ষ্য করা যায়। হালকা সবুজ সামরিক পোশাক পরা সেনা সদস্যরা সংসদীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করতে ভিড় করেন। সাংবাদিকরা তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এএফপির সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, সোমবারের অধিবেশনে সামরিক নেতা মিন অং হ্লাইংকে সংসদ ভবনে দেখা যায়নি। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তার ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
মায়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। সামরিক সরকারের আয়োজিত নির্বাচন ও নতুন সংসদ গঠনের মধ্য দিয়ে দেশটি একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। তবে এই অধ্যায় গণতন্ত্রের পথে অগ্রগতি নাকি সামরিক শাসনের নতুন রূপ—তা এখনো সময়ই বলে দেবে।