প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরান এবং ইসরায়েল-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসনের পর প্রথমবারের মতো সেজিল-২ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। ইরানি সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেজিল-২ সহ একাধিক অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবকাঠামো লক্ষ্য করে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে।
ইরানের তৈরি সেজিল-২ একটি মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র। এটি কঠিন জ্বালানি ব্যবহার করে এবং প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে সক্ষম। সেজিল-২ ক্ষেপণাস্ত্রের ওজন প্রায় ২৩ হাজার ৬০০ কেজি এবং দৈর্ঘ্য প্রায় ১৮ মিটার। এটি প্রায় ৭০০ কেজি ওজনের বিস্ফোরক বহন করতে সক্ষম। যাত্রাপথের সময় এটি উচ্চতা পরিবর্তন করতে পারে এবং এর দিক পরিবর্তনের ক্ষমতার কারণে নেটওয়ার্ক বিশেষজ্ঞরা এটিকে ‘ড্যান্সিং মিসাইল’ বা ‘নাচুনে ক্ষেপণাস্ত্র’ বলে অভিহিত করেছেন।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) তথ্য অনুযায়ী, সেজিল-২ ক্ষেপণাস্ত্র ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে নকশা করা হয় এবং ২০০৮ সালে প্রথম পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ হয়। পরবর্তী কয়েকটি উৎক্ষেপণে দেখা যায়, ক্ষেপণাস্ত্রটি ১ হাজার ৯০০ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়তে সক্ষম। কঠিন জ্বালানির ব্যবহারের কারণে এটি দ্রুত প্রস্তুত করা যায় এবং শত্রু অঞ্চলে পাঠানো সম্ভব, যা পূর্ববর্তী তরল জ্বালানি ব্যবহারকারী শাহাব সিরিজের ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় এটিকে কৌশলগতভাবে আরও কার্যকর করে তোলে।
সেজিল-২ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে ইরান প্রথমবারের মতো সরাসরি ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। এর মাধ্যমে ইরান বিশ্বের কাছে তার কৌশলগত সক্ষমতা প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়েছে। সেজিল-২-এর লঘু প্রতিক্রিয়াশীলতার কারণে এটি বিভিন্ন ধরণের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়াতে পারে।
ইরান ও ইসরায়েল-মার্কিন সংঘাত গত মাসে শুরু হয়, যখন ইরানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ওপর যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যৌথ হামলা চালায়। হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান তার সেজিল-২ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে প্রতিরোধমূলক আক্রমণ চালায়। এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য পাওয়া গেছে। এরপর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ আরও ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।
উভয় পক্ষের সংঘাতে ইতিমধ্যে দুই হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যার বেশিরভাগই ইরানি। পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলী বাহিনী ইরানের ১৫ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে পেন্টাগন ওই অঞ্চলে ইউএসএস ত্রিপোলি যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে, যেখানে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মার্কিন মেরিন মোতায়েন করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সেজিল-২ ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার ইরানের কৌশলগত পরিকল্পনা এবং তার সামরিক ক্ষমতার সূচক। এটি ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশলকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও শক্তিশালী করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এছাড়া, ‘ড্যান্সিং মিসাইল’ হিসেবে পরিচিত হওয়ার কারণে ক্ষেপণাস্ত্রটির গতি ও যাত্রাপথ পরিবর্তনের ক্ষমতা শত্রুর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জিং করে তোলে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সেজিল-২ ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ ক্ষমতা ইরানকে প্রতিশোধমূলক হামলা এবং কৌশলগত প্রতিক্রিয়া প্রদানে সুবিধা দিচ্ছে। এটি ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে তার কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করতে সাহায্য করছে। ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র এই নতুন হুমকির মোকাবিলায় তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করতে বাধ্য হয়েছে।
এই হামলা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, তেলের সরবরাহ চ্যানেলগুলোতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে ইরান প্রথমবারের মতো সরাসরি ইসরায়েলি অবকাঠামোতে আঘাত হানার মাধ্যমে নিজের সামরিক ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য নতুন ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত সংবেদনশীল। ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা উদ্বিগ্ন। তারা মনে করছেন, এই সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, তেলের বাজার এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতি পরিবর্তন করতে পারে।